গত কোরবানির ঈদে পশুর চামড়া কিনতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, তার সিংহভাগই আদায় হয়নি। এমনকী আগের বছরগুলোতে নেওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পায়নি ব্যাংকগুলো। সে কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এবারের সিদ্ধান্ত, গত বছরের নেওয়া ঋণের কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ পরিশোধ না করলে, এবার নতুন ঋণ নিতে পারবেন না চামড়া ব্যবসায়ীরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঈদ-উল আজহা উপলক্ষে ব্যাংকগুলো ২০১৫ সালে ৬৬৪ কোটি, ২০১৪ সালে ৫শ কোটি এবং ২০১৩ সালে ৪৬১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল।
তবে জানা গেছে, চামড়াখাতে এ বছর ঋণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও বেসিকসহ নয় ব্যাংক এবার চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীদের ৭১০ থেকে ৭২০ কোটি টাকা ঋণ দেবে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, চামড়াখাতের ঋণ আদায় না হওয়ায় এক সময় তা খেলাপিতে পরিণত হয়। পরে তা অবলোপন (ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে আলাদা রাখা) করা হয়। এ খাতের বেশিরভাগ ঋণের বিপরীতে ব্যাংক কোনও জামানত নেয়নি। এ কারণে মামলা করেও এই ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বছরই এই খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমছে। সোনালী ব্যাংক ১০০টি থেকে কমিয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে, জনতা ব্যাংক ৭৮টি থেকে কমিয়ে ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে, রূপালী ব্যাংক ৩০টি থেকে কমিয়ে চারটি এবং অগ্রণী ব্যাংক ৭৫টি থেকে কমিয়ে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এবার ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বছর চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীদের নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ দেওয়া হবে। যারা ভালো গ্রাহক কেবলমাত্র তাদেরকেই ঋণ দেওয়া হবে। তবে ঋণ বিরতণের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে সামান্য বেশি হতে পারে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চামড়া খাতে ব্যাংকগুলো দুই হাজার ৮শ কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২শ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও প্রায় ৮শ কোটি টাকা আদায় না হওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে।
জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক থেকে ২৫০টির বেশি ট্যানারি ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক প্রায় ১৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের (বিআইবিএম) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবলোপন করা এসব ঋণ আর কখনই আদায় হবে না। চামড়াখাতের ঋণের বড় অংশই অন্যখাতে স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে এই খাতে খেলাপি ঋণের মাত্রাও বেশি।
এদিকে, বিশ্ব বাজারে চামড়ার দরপতন, ব্যবসায় মন্দা, ট্যানারি স্থানান্তরসহ নানা সংকটের কথা বলে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের দাবি জানিয়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দার কারণে বাংলাদেশেও চামড়ার বাজারে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বড় অংকের অর্থ ব্যয়। এছাড়া গত বছরের সংগৃহীত অনেক চামড়া এখনও বিক্রি হয়নি। এসব কারণে অনেকেই ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারছি না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছর সোনালী ব্যাংক ২০১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করলেও এর মধ্যে আদায় হয়েছে, মাত্র ৩৯ লাখ টাকা। এছাড়া খেলাপি হয়ে গেছে, ৪৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। কিস্তি পরিশোধ না করায় বকেয়া পড়ে আছে, ১২৬ কোটি টাকা। গত বছর তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটির বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখা। এবারও ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানই ঋণের জন্য আবেদন করেছে। সব মিলিয়ে ওই তিনটি প্রতিষ্ঠান ১৭০ কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে।
রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, চামড়াখাতে তারা আগে বেশি ঋণ দিলেও এখন কম দিচ্ছে। গত বছর তারা চামড়া কিনতে ৫৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। সেগুলোর বেশির ভাগই আদায় হয়নি। এবার এই ব্যাংকটি থেকে সর্বোচ্চ ৬০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হতে পারে।
অগ্রণী ব্যাংক সূত্র জানায়, গত বছরের মতো এ বছরও চাহিদামাফিক ঋণ বিতরণ করবে ব্যাংকটি। গত বছর ব্যাংকটি ১৩০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছিল। শাখাগুলোতে ঋণের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এ খাতের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে গত চার বছরে অগ্রণী ব্যাংক ৬১৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৫৬ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। অগ্রণী ব্যাংকের চামড়া খাতের খেলাপি ঋণ ৩৫০ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানায়, গত বছর কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে ২০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র ২৯ গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন। বাকি ৪৯ গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করছেন না। এর মধ্যে ২৪ গ্রাহকের ১৭৬ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করা হয়। ঋণ পরিশোধ না করায় ৬ গ্রাহকের খেলাপি হয়ে আছে ৯৪ কোটি টাকার ঋণ। এ ছাড়া সম্প্রতি ১১ গ্রাহক পুনঃতফসিল করেছে ৯২ কোটি টাকার ঋণ। এ বছর জনতা ব্যাংক এ খাতের জন্য ২৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক চামড়া শিল্পে গত বছরের মতোই এবারও ১০ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারে। এর বাইরে সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি বিশেষায়িত ও বেসরকারি ব্যাংকও চামড়া কিনতে ঋণ দেবে। সরকারি খাতের বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারে। চামড়া কিনতে বেসরকারিখাতের ইউসিবি ২০ কোটি এবং সিটি ব্যাংক ১৮ কোটি টাকা ঋণ দিতে পারে।
আরও পড়ুন
সিঙ্গাপুরে জিকায় আক্রান্ত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ১৯
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির ফাঁসিতে যে কারণে চুপ ছাত্রশিবির
/এসএনএইচ/এবি/আপ- এসটি /








