হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সরিয়ে নিতে প্রায় দেড় যুগ সময় পেয়েছেন কারখানাগুলোর মালিকরা। তারপরও হাজারীবাগ থেকে সরেনি কারখানাগুলো। আর এর পেছনে এখনও বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা বলছেন, সাভারে কারখানা সরিয়ে নিতে বলা হলেও সেখানে শতভাগ কারখানায় গ্যাস সংযোগ নেই, ব্যাংক ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারবেন না, শ্রমিকদের বেতন আটকা পড়বে। এমনকি বিদেশি ক্রেতা হারাবেন বলেও অভিযোগ তুলছেন তারা। কারখানা সরাতেই হবে— আদালতের এমন চূড়ান্ত রায়ের পর রবিবার (১২ মার্চ) এক সংবাদ সম্মলনে এসব অভিযোগ নিয়ে হাজির হয় মালিক সমিতিগুলো। তবে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রায় বাস্তবায়নে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
২০১৩ সালে একনেক সভায় দ্বিতীয় দফায় চামড়া শিল্পনগর প্রকল্পের সংশোধনী অনুমোদন দেয় সরকার। ট্যানারি কারখানা সরাতে খরচের বেশিরভাগ টাকা সরকার ও বাকি টাকা শিল্প মালিকদের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে বলেও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। তবে এই ঋণ নিয়েই যত আপত্তি শিল্প মালিকদের। তাদের বক্তব্য, প্রায় পাঁচ দশকের শিল্প এক স্থান থেকে অন্যস্থানে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। ঋণ না দিয়ে বরং আর্থিক সহায়তা হিসেবে এ টাকা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
এখন সরকারকে দোষারোপ করলেও বিভিন্ন সময়ে ট্যানারি মালিকদের বিভিন্ন অজুহাতের কারণে সরকারই বারবার সময় বাড়িয়ে তাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু কোনোবারই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালিকরা কারখানা স্থানান্তর করেননি। মালিকদের এ ধরনের গড়িমসিতে ক্ষুব্ধ শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গত বছর কারখানাগুলোকে হাজারীবাগ ছাড়তে ৭২ ঘণ্টা সময়ও বেঁধে দেন। তাতেও কাজ হয়নি। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়ার পর হাজারীবাগে কাঁচা চামড়ার প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশি পাহারা বসানো হয়। এমনকি বারবার বলার পরও কারখানাগুলো না সরানোয় ১৫৪টি ট্যানারিকে পরিবেশের ক্ষতির জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছেন সর্বোচ্চ আদালত।
এ ধরনের অভিযোগ তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অংশ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে পরিবেশবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো সরিয়ে নিতে সর্বশেষ ২০১০ সালের অক্টোবরে ছয় মাস সময় দিয়েছিলেন হাই কোর্ট। সে অনুসারে ২০১১ সালে ৩০ এপ্রিলের পর হাজারিবাগে কোনও ট্যানারি চালানোর অনুমোদন নেই।’
এদিকে, গত ৬ মার্চ হাইকোর্ট এক রায়ে এখনও হাজারীবাগে থেকে যাওয়া ট্যানারি কারখানা অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেন। এছাড়া পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর মালিকপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে সময় চেয়ে আপিল করলে রবিবার (১২ মার্চ) আবেদন খারিজ করে রায় বহাল রাখেন আদালত।
রায়ের পর বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আরেকটু সময় পেলে আমরা ভালোভাবে ট্যানারিগুলো সরাতে পারতাম।’ এতদিন পর তাদের কেন আরও সময় লাগবে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাভারে ট্যানারি কারখানাগুলোয় এখনও শতভাগ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ সরকার দিতে পারেনি। যতদিন পর্যন্ত আমরা এসব সংযোগ না পাব, ততদিন আমাদের কাজ বন্ধ থাকবে। কিন্তু কর্মচারীদের বেতন চালিয়ে যেতে হবে। আবার ব্যাংকের ঋণও হয়তো সময়মতো পরিশোধ করতে পারব না। তাতে আমাদের দেউলিয়াও ঘোষণা করতে পারে ব্যাংকগুলো।’
শঙ্কা জানিয়ে শাহীন আহমেদ বলেন, ‘এরই মধ্যে যেসব বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে মালের অর্ডার নেওয়া আছে, তা সময়মতো তাদের সরবরাহ করতে পারব না। এতে চামড়া রপ্তানি বাজারও হারাব আমরা।’
আদালতের রায় অগ্রাহ্য না করে তা মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও অভিযোগের স্বরে ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোটার্স অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি মাহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাস্তবতা হলো আমরা ভুক্তভোগী। আমরা জেনেছি যে আমাদের আপিল খারিজ হয়েছে। আদালতের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে এখনও আমরা কোনও লিখিত নোটিশ পাইনি। নোটিশ পেলেই আমরা আমাদের মতো করে ট্যানারি সরিয়ে নেব।’
আরও পড়ুন-
নৌবাহিনীতে সাবমেরিন: কৌশলগতভাবে মিয়ানমারের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ








