বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডে ঋণ নেওয়া

গোলাম মওলা
০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:১০আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:৪১

ক্রেডিট কার্ড (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)


‘ইলেক্ট্রনিক মানি’ খ্যাত ক্রেডিট কার্ডের প্রতি মানুষের দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। একবছরে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ নেওয়া বেড়েছে ২৩০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা ঋণ নিয়েছিলেন ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি থেকে মুক্তি ও জামানত ছাড়া ঋণ সুবিধার কারণে তুলনামূলকভাবে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের চাহিদা বেশি। আবার উচ্চ সুদ হার ও নামে-বেনামে হিডেন চার্জ আরোপ করে ব্যাংকও ভালো আয় করে এই খাত থেকে। কোনও কোনও ব্যাংক ব্যয়বহুল এই কার্ডে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশেরও বেশি সুদ নিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, কোনও ধরনের জামানত ছাড়া ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে একজন  গ্রাহককে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। এছাড়া, সহজে নগদায়ন করা যায় এমন ‘তরল জামানত’ থাকলে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ডে সুদ বেশি হলেও জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়া যায়। এছাড়া, যারা নগদ টাকা বহন করতে চান না, তারা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। যেহেতু ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া ঋণ দেয়, সেহেতু এ খাতে ঝুঁকিও বেশি। এ কারণে ক্রেডিট কার্ডে অতিরিক্ত সুদ নেয় ব্যাংকগুলো। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হিডেন চার্জও নেওয়া হয়। যদিও এটা ঠিক না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক ব্যাংক খাতের ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটের কাছাকাছি নিচে নেমে এলেও ক্রেডিট কার্ডে ঘোষণা দিয়ে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে ব্যাংকগুলো। কোনও কোনও ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড সেবার বিপরীতে ২৭ থেকে ২৮ ধরনের ফি (মাশুল) নিচ্ছে। ব্যাংকভেদে ফি’র নাম ভিন্ন হলেও চার্জ কাটা হয় প্রায় একইহারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

জানা গেছে, অনেকে নগদ টাকার বদলে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পণ্য কেনেন। যদিও ব্যাংকের কাছে এই ক্রেডিট কার্ড হচ্ছে একটি পণ্য। অন্যান্য ঋণে সুদের হার বার্ষিক হারে আরোপিত হলেও ক্রেডিট কার্ডে সুদ দিতে হয় মাসিক ভিত্তিতে। দেখা গেছে, ক্রেডিট কার্ডের বেশির ভাগ ভোক্তাই সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী।  

প্রসঙ্গত, ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩১টি ব্যাংক গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ আদায় করায় সম্প্রতি ১৮টি ব্যাংককে শোকজ চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার নীতিমালার আলোকে আদায় করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য বলছে— ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বাড়লেও গাড়ির ঋণ কমে গেছে। শুধু তাই নয়, গাড়ির ঋণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত বছরের শেষে গাড়ির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকায়, যা ২০১৬ সালে ছিল ২ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আবার গাড়ির ঋণ কমলেও বেড়েছে ভোক্তা খাতে বাড়ি বা আবাসন ঋণ। ২০১৭ সালের শেষে আবাসন খাতের ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তৈরি পোশাক খাতে ঋণ যেমন বেড়েছে, তেমনই  বেড়েছে খেলাপি ঋণও। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৭৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের শেষে পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালের শেষে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে বস্ত্র খাত তথা টেক্সটাইল খাতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৫৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে বস্ত্র খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ছিল ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

নির্মাণ শিল্প খাতে একবছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে এই খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আবার ২০১৬ সালে এ খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের শেষে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, এই খাতে ২০১৬ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা।

ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট বলছে, ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ১০টি ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি ৪৭ ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আর পাঁচটি ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে রিপোর্টে কোনও ব্যাংকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। 

 

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম