বালু রফতানির সিদ্ধান্তে অগ্রগতি নেই

শফিকুল ইসলাম
০৬ মার্চ ২০১৯, ১৮:৪৯আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৯:৫০

বালু  (ছবি- সংগৃহীত)

বালু রফতানি করে প্রতি বছর ৭০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। সরকারের কাছে দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বালু রফতানির প্রস্তাবও দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বালু রফতানি প্রস্তাবনার বিরোধিতা করেছে খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, বিদেশে বালু রফতানি করলে প্রচুর পরিমাণে খনিজসম্পদ দেশ থেকে হারিয়ে যাবে।  

সূত্র মতে, ২০১৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভায় বালু রফতানির পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনাও হয়েছিল। এরপর নানা কারণে বিষয়টির আর কোনও অগ্রগতি হয়নি।

অন্যদিকে, খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় দুই দশক আগে সামুদ্রিক বালু নিয়ে একটি সমীক্ষা ছাড়া কোনও কাজ করেনি। ১৯৯৫ সালে পরিচালিত খনিজসম্পদ বিভাগের ওই সমীক্ষায় জানা যায়, সামুদ্রিক বালুতে শক্তিশালী ধাতু রয়েছে। এই বালু যদি পরিশোধন করা যেত, তবে বাংলাদেশ উপকৃত হতো। তবে সামুদ্রিক বালুতে নিজস্ব কোনও খনিজসম্পদ নেই। মূলত নদী থেকে খনিজসম্পদ  ভেসে এসে সমুদ্রের বালুতে মিশ্রিত হয়। তাই সামুদ্রিক বালুর চেয়ে নদীর বালু ও মাটিতে পর্যাপ্ত খনিজসম্পদ থাকতে পারে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ আছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, সরকার নদীগর্ভের বালু রফতানির পরিকল্পনা করেছে। সামুদ্রিক বালু বিক্রি বা রফতানির আপাতত কোনও পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন জানান, বিদেশে বালু রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।এশিয়া মহাদেশে এই বালুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মাটি ও বালু দিয়ে অনেক দেশ জমি বাড়িয়ে বসতি স্থাপনে আগ্রহী।

‘নেটওয়ার্ক ও ইনফ্রাসট্রাকচার কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে  এক দশমিক পাঁচ মিলিয়ন টন বালু সিঙ্গাপুরে রফতানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও সরকারের তরফ থেকে এখনও কোনও সাড়া মেলেনি।

প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এম কে মামুনুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সিঙ্গাপুরে বালু রফতানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদেরকে কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।

সূত্র মতে, বালু রফতানির জন্য স্টোন ট্রেডার্স, লাইফ ইন্টারন্যাশনালসহ আরও  কয়েকটি কোম্পানির প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। তাদেরকেও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাটি ও বালু রফতানির বিষয়ে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, পণ্য রফতানি করতে গিয়ে যেন পরিবেশের কোনও ক্ষতি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বালু রফতানির বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়েরও বেশকিছু পর্যবেক্ষণ  রয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয় মনে করে, অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, অবাধে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হয় কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে,২০১৪ সালের ২২ জুলাই নতুন পণ্যের রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আট  সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।ওই বৈঠকে তৎকালীন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন— ‘পরিবেশের ক্ষতি না হলে বালু রফতানি করা যেতে পারে।’

পরে কমিটির বৈঠকে বালু রফতানির নীতিমালা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় বালু রফতানির প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি বেশি দূর এগোয়নি বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র জানায়, বঙ্গোপসাগরের সৈকত থেকে খনিজ সমৃদ্ধ ভারী বালু উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল সরকার। ১৯৭৫ সালে কক্সবাজারের কলাতলীতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন একটি বিশেষায়িত কেন্দ্র স্থাপন করে। এর ৪৩ বছর পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৈকতের তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু, মাটি ও পাথর উত্তোলনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরমাণু শক্তি কমিশনের খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রগুলো উপকূলীয় এলাকায় মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান ও আহরণ কাজে নিয়োজিত আছে বলে জানা গেছে।

কমিশনের দাবি, গত চার দশকে তাদের বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও অনুসন্ধানে ১৭টি ভারী খনিজ স্তুপ আবিষ্কার  হয়েছে। হরেক রকম খনিজ দ্রব্যের বিস্তৃতি, মজুত এবং গুণগত মানও নির্ণয় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় যেসব ভারী ও তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু চিহ্নিত করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে— ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল, টাইটানিয়াম, লিউকক্সিন, কেনাইট ও মোনাজাইট। এছাড়া, কুয়াকাটা ও খুলনার সমুদ্র সৈকত ও উপকূলভাগে এ ধরনের খনিজ, ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের এক সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, এককভাবে কক্সবাজারেই বার্ষিক এক দশমিক ৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেজষ্ক্রিয় ভারী খনিজ বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলন করা সম্ভব। যার একাংশ দেশের শিল্প-কারখানায় কাজে লাগানো যেতে পারে। বাকিটা বিদেশেও রফতানি হতে পারে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়টিকে জাতীয় স্বার্থেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণায় বালু থেকে পাওয়া খনিজ পদার্থ খুঁজে বের করতে পারলে, দেশের সুনাম, সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সবই বাড়বে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের সমুদ্র উপকূল থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার তেজষ্ক্রিয় ভারী বালুসহ এ ধরনের দ্রব্য বিক্রি ও রফতানি করা সম্ভব, যা বর্তমানে অব্যবহৃত এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। উচ্চ তেজষ্ক্রিয় (হাইলি রেডিয়েটেড) ও ভারী খনিজ বালু উত্তোলনের সময় জনস্বাস্থ্যের ওপর যাতে কোনও ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে, এজন্য পরমাণু বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের বেশিরভাগ অংশেই রয়েছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের হরেক রকম ভারী ও তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু। সারা বিশ্বে এসব পদার্থের ইতিবাচক ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে।

খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের বালু রয়েছে। একটি হচ্ছে জিরকন বালু, যা অবকাঠামো নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হয়। অন্যটি হচ্ছে খনিজ বালু। এর মধ্যে কয়েক ধরনের খনিজ পদার্থ রয়েছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর বালুতে খনিজ পদার্থের পরিমাণ বেশি। সূত্র বলছে, আই ফোনের ওপরিভাগের স্ক্রিন তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, এর মধ্যে এই খনিজ পদার্থ রয়েছে। তাই ব্রহ্মপুত্রের বালু খুবই মূল্যবান।

জানতে চাইলে খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শহীদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি ট্রাক  খনিজ বালু বিক্রি হয় দুই থেকে তিন হাজার টাকায়। অথচ এই বালু পরিশোধন করে যদি খনিজ পদার্থ তুলে আনা যায়, তাহলে তার মূল্য দাঁড়াবে কয়েক লাখ টাকা। তাই এই মুহূর্তে বালু রফতানি করাটা ঠিক হবে না। এছাড়া, পরবর্তীতে এই বালুর ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই স্বীকৃতি পেতেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’         

উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপ সরকার বাংলাদেশ থেকে বালু আমদানির আগ্রহের কথা জানিয়েছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার কাছে বালু আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

সিঙ্গাপুরের ২০ ভাগ জমি তৈরি করা হয়েছে আমদানি করা বালু দিয়ে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে বালু আমদানি করে সিঙ্গাপুর সরকার। ১৯৬০ সাল থেকে এই দ্বীপ দেশটি এভাবে বালু দিয়ে সমুদ্র ভরাট করে স্থলভাগ বাড়াচ্ছে।  

সিঙ্গাপুর বিজনেস অনলাইন পোর্টাল ট্রেড উইন্ডস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির শিল্প-বাণিজ্যের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রচুর পরিমাণে মাটি ও বালুর চাহিদা রয়েছে। শুধু সিঙ্গাপুরই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভূমি সম্প্রসারণের জন্য মালদ্বীপ সরকারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বাংলাদেশ থেকে মাটি ও বালু আমদানির ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বালু রফতানির বিষয়ে এখনও কোনও নির্দেশনা বা ধারা এখনও যুক্ত হয়নি।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
সান মারিনোর বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ 
সান মারিনোর বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ 
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী