X
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২
১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

মিলেমিশে সুদ মওকুফ আড়াই হাজার কোটি টাকা

গোলাম মওলা
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০০আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:০৪

সরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে  সুদ মওকুফের ঘটনা বেশি ঘটছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের বিতরণ করা ঋণে সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। যা আগের প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিল মাত্র ১৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বেশি সুদ মওকুফ করেছে, যা প্রায় ১২ গুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সুদ মওকুফ পাওয়া গ্রাহকদের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সুদ মওকুফের সিংহভাগ সুবিধা নিয়েছেন ব্যাংকের পরিচালকরা। কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন অন্যান্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে মিলেমিশে যোগসাজশের মাধ্যমেও সুদ মওকুফ করছে।

অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, সবসময় বড় ঋণখেলাপিরা বেশি সুদ মওকুফ-সুবিধা পান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকরা এই সুবিধা থেকে অনেক দূরে থাকেন। এই প্রক্রিয়ার একটি বড় কুফল হচ্ছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির পরিমাণ বাড়ে।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের পরিচালক, পরিবারের সদস্য বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের যে বাধ্যবাধকতা দেওয়া ছিল, গত ২৪ মে তা তুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই শর্ত শিথিলের পরই ব্যাংক ও পরিচালকরা কৌশলে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিচ্ছেন। যদিও এই শর্ত শিথিলের আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে দেশের শীর্ষ দুই ব্যবসায়ী গ্রুপ একে অপরের ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সুদ মওকুফ সুবিধা নেয়।

অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অনাদায়ী ঋণের আসল টাকা আদায় করতে গিয়ে সুদ মওকুফের কৌশল নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। তবে কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন অন্যান্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে মিলে যোগসাজশের মাধ্যমেও সুদ মওকুফ করছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, অনাদায়ী ঋণের আসল টাকা আদায়ে ব্যাংক গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিয়েছে। আগের সময়ে অনেক গ্রাহকের ঋণ মন্দমানের ঋণের মূল আদায় করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো কিছুটা সুদ মওকুফ হয়তো করেছে, যে কারণে চলতি বছরের জুনে এর পরিমাণটা বেড়ে গেছে।

হঠাৎ করে সুদ মওকুফ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা পরিপন্থি উপায়ে সুদ মওকুফ করে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের পরস্পর যোগসাজশের মাধ্যমে এক ব্যাংকের পরিচালকের ঋণের সুদ আরেক ব্যাংক মওকুফ করে দিচ্ছে। আবার নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে ব্যাংকের পরিচালকরা মিলেমিশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণও নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ কোটি ৯৮ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। এসব ঋণের মধ্যে এক ব্যাংকের পরিচালকদের অন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। তিন মাস আগে পরিচালকদের এ ধরনের ঋণের স্থিতি ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় থাকাকালীন ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ২০২০ সালে করেছে ১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা এবং বিদায়ী ২০২১ সালে ব্যাংকগুলো ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ঋণের সুদ মওকুফ করেছে।

 এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর  বলেন, খেলাপি গ্রাহকের সার্বিক অবস্থা সত্যিকারের খারাপ থাকলে সেই ঋণের আসল টাকা আদায়ে সুদ মওকুফ করা হয়। ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থে এটি করে থাকে, তবে অনেকেই চতুরতার মাধ্যমে এই সুবিধা নেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ঋণ পরিশোধে অনেকেই নিরুৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের জমা রাখা টাকা ফেরত দিতে পারে না, অথচ সেই ব্যাংক সুদ মওকুফ করেছে। ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৩ হাজার ১৬৬ কোটি ১২ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকগুলো।

 বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে, যেমন- ঋণগ্রহীতার মৃত্যু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, মড়ক, নদীভাঙন, দুর্দশাজনিত কারণে বা বন্ধ প্রকল্প ইত্যাদি কারণে ব্যাংক কর্তৃক ঋণের সুদের সম্পূর্ণ অংশ বা অংশবিশেষ মওকুফ সুবিধা প্রদানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, বর্ণিত বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন গ্রাহকের অনুকূলে প্রায়শই সুদ মওকুফ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর এই বছরের জুন মাস শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা খেলাপি রয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ২১.৯৩ শতাংশ। এদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

কয়েক বছর আগে গ্রাহকের সুদ মওকুফ করতো কেবল সরকারি ব্যাংকগুলো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি থাকলেও সুদ মওকুফে এগিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। চলতি বছরে (এপ্রিল-জুন) সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে ৮২২ কোটি টাকা, এরমধ্যে সুদ মওকুফ হয়েছে ১৯ কোটি টাকা। এছাড়া, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা, অথচ তারা সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে জানায়, ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারবে। তবে জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের সুদ এবং মূল মওকুফ করা যাবে না।  একইসঙ্গে, ঋণের সুদ মওকুফ অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সুদ মওকুফে অপরিহার্য ক্ষেত্রে তহবিল ব্যয় আদায়ের শর্ত শিথিল করার জন্য এর যৌক্তিকতা নিশ্চিতকরণে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে হেড অব ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স (এইচআইসিসি)-এর মতামত গ্রহণ করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালক, এবং তার পরিবারের সদস্যরা বা পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহীত ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ২৮-এর পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনও ব্যাংক-কোম্পানির কাছ থেকে তার পরিচালক, তার পরিবারের সদস্য, ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক, জামিনদার, পরিচালক-অংশীদার, ম্যানেজিং এজেন্ট হিসেবে স্বার্থ রয়েছে, কোনও ব্যক্তির সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালক জামিনদার বা অংশীদার হিসেবে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তাদের ঋণের সুদ মওকুফ করা যাবে না।

আইনের এই ধারা লঙ্ঘন করে সুদ মওকুফ করলে অন্যূন ৩ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এদিকে, ব্যাংকগুলোর হাতে পুনঃতফসিলের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দেওয়ার পর পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। আগের প্রান্তিক, মার্চে ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ অবলোপন ও খেলাপি বৃদ্ধির মার্চের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কারণ জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে দেখা যায়, অবলোপনকৃত ঋণ থেকে আদায়ের হারে অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ঋণ আবলোপন করা হয়েছে ৫৪৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আদায় হয়েছে ৩৫৭ কোটি টাকা।

/এমআর/এমওএফ/
ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্ত হওয়ায় কোন পথে এগোয় যুদ্ধ
ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্ত হওয়ায় কোন পথে এগোয় যুদ্ধ
অনুশীলনে প্রাণবন্ত এক আর্জেন্টিনা
অনুশীলনে প্রাণবন্ত এক আর্জেন্টিনা
নেইমার-রিচার্লিসন ছাড়া রিজার্ভ বেঞ্চের সামর্থ্য বুঝলো ব্রাজিল
নেইমার-রিচার্লিসন ছাড়া রিজার্ভ বেঞ্চের সামর্থ্য বুঝলো ব্রাজিল
পাহাড় থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
পাহাড় থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
সর্বাধিক পঠিত
আঙুলের অপারেশনে শিশুর মৃত্যু, গোসলের সময় দেখা গেলো পুরো পেটে সেলাই
আঙুলের অপারেশনে শিশুর মৃত্যু, গোসলের সময় দেখা গেলো পুরো পেটে সেলাই
শাহবাগে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড: রমনা ডিসি
শাহবাগে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড: রমনা ডিসি
তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব’ বললেন ওবায়দুল কাদের
তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব’ বললেন ওবায়দুল কাদের
বিএনপির সমাবেশে খালেদা জিয়ার যোগদান নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী
বিএনপির সমাবেশে খালেদা জিয়ার যোগদান নিয়ে যা বললেন তথ্যমন্ত্রী
টিভিতে আজকের খেলা (২ ডিসেম্বর ২০২২)
টিভিতে আজকের খেলা (২ ডিসেম্বর ২০২২)