নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত স্বপ্নের পদ্মা সেতুর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির আকার আরও বড় হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরিশাল। পদ্মা সেতুর বদৌলতে বদলে যাচ্ছে বরিশালের অর্থনীতিও। নতুন মেরুকরণ হবে সেখানকার অর্থনীতির। এতদিন পচে যাওয়ার ভয়ে বরিশালের আমড়া আর পেয়ারা ঢাকায় আনা সম্ভব হতো না। এখন আর সেই বিপত্তি নেই। গাছ থেকে নামিয়ে আনার সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকায় আসছে বরিশালের আমড়া ও পেয়ারা।
গত বছরের জুন মাসে পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে থেকেই নতুন স্বপ্নের জাল বুনছেন বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি আর ঝালকাঠির ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। পদ্মা সেতুর কারণে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন দিগন্ত। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের চালচিত্র।
জানা গেছে, পদ্মা সেতুর কারণেই এলাকার কৃষিপণ্য এখন সহজেই ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। শিল্প-কলকারখানা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলায় জমির মূল্য বেড়েছে। বিশেষ করে স্বরূপকাঠির পেয়ারা, আমড়া, সুপারি, নারকেল, কাঠ, নার্সারির বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি গাছের চারা ও ফুল এবং বানারীপাড়ার বিখ্যাত বালাম চাল ও আমড়া, পেয়ারা, নারকেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে সহজে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে। এতে দারুণ খুশি এ অঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
জাইকা পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সেতুর কার্যক্রমের ফলে দেশের জিডিপির হার বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে। আর পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের সমাপ্তি হলে জিডিপি আরও ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর আঞ্চলিক পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ০১ শতাংশ এবং জাতীয় পর্যায়ে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হ্রাস করবে। যা দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনে বিরাট ভূমিকা রাখবে। এ তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু দেশের জিডিপিতে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ২ শতাংশ অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। পদ্মা সেতু প্রতি বছর ১৮ থেকে ২২ শতাংশ বিনিয়োগের অর্থনৈতিক হার (ইআরআর) প্রদান করবে, যা প্রতি বছর বাড়বে। এমন প্রত্যাশাও সরকার সংশ্লিষ্টদের।
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, আগে পিরোজপুরের কাউখালী, স্বরূপকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া ও ঝালকাঠি থেকে রাজধানী ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। ফেরির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কখনও কখনও এর চেয়েও বেশি সময় লাগতো। এখন সেখানে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় পৌঁছানো যাচ্ছে। সড়কপথে রাজধানীর দূরত্ব কমছে প্রায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এসব পণ্য এতদিন নদী ও সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে আসছিল। এতে সময়ক্ষেপণ, ফেরিতে আটকা পড়া ও পণ্য পচে যাওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে সব প্রতিবন্ধকতার অবসান ঘটিয়ে সব ধরনের কাঁচা পণ্য টাটকা অবস্থায় রাজধানী হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার বাসিন্দা নারায়ণ দাশ জানিয়েছেন, আগে পেয়ারা আর লেবু বিক্রি করে কম দাম পেতাম। এ কারণে পেয়ারা বাগান পরিবর্তন করে অন্য কিছু চাষাবাদের চিন্তা করছিলাম। এখন সেই চিন্তা বাদ দিয়েছি। পদ্মা সেতু চালুর হওয়ার পর পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বেড়েছে দাম। ফলে আমরা লাভবান হতে শুরু করেছি। তিনি জানান, সামনে রোজা আসছে। আমরা দিনে দিনেই গাছ থেকে লেবু ছিঁড়ে রাজধানীতে পাঠাতে পারবো। রাজধানীবাসী সকালের লেবু বিকালে হাতে পাবেন বলে আশা করছি।
বানারীপাড়ার চাল ব্যবসায়ী আমানত আলী এবং কাউখালীর আমড়া ব্যবসায়ী সেকেন্দার হোসেন জানিয়েছেন একই তথ্য। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার ফলে বানারীপাড়ার আমন আর বালাম চাল সন্ধ্যায় পাঠালে তা মধ্যরাতের আগেই রাজধানীতে পৌঁছে দিয়ে সকাল নাগাদ পণ্যবাহী ট্রাকটি বানারীপাড়ায় ফিরে আসছে। এতে খরচ কমেছে। একই প্রক্রিয়ায় পাঠানো হচ্ছে আমড়া- এমন তথ্য জানিয়েছেন সেকেন্দার হোসেন।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর ফলে সময় কম লাগছে। আগে সারা রাত ব্যবসা করে সকালে বাড়ি ফিরতাম। এখন মধ্যরাতেই ব্যবসা গুছিয়ে বাসায় ফিরি। মুনাফাও ভালো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর কারণে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লে আগামী অর্থবছরে এর সঙ্গে যুক্ত হবে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ হলে যোগ হবে ৫২ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশ হলে যোগ হবে ৬৪ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ হলে যোগ হবে ৮০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপিতে অর্থ যোগ আরও বাড়বে। ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে জিডিপিতে যোগ হবে ৫৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ হলে যোগ হবে ৬৬ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশ হলে জিডিপিতে যোগ হবে ৭১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে জিডিপিতে যোগ হবে ৮৯ হাজার কোটি টাকা। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৫৬ লাখ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরেও জিডিপিতে আনুপাতিক হারে অর্থ যোগ হবে।
সূত্র জানিয়েছে, পদ্মা সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৯টি জেলার ৩ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। ওইসব জেলায় পর্যটন, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ হতে শুরু করেছে। ঢাকা, উত্তরাঞ্চল ও চট্টগ্রাম থেকে জেলাগুলোতে স্বল্প সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পদ্মার ওপারে উৎপাদিত পণ্য দ্রুত ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চলে আসছে। এছাড়া চলাচলে মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। এভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ হচ্ছে পদ্মা সেতুর কারণে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা ও মোংলার মধ্যে দূরত্ব ২৭৪ কিলোমিটার থেকে ১৭০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। জাইকা অনুমান করেছে, ঢাকা থেকে ভ্রমণের সময় ১০ শতাংশ হ্রাস করে জেলাভিত্তিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করবে, যা এই অঞ্চলের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলাগুলোয় ভ্রমণের সময়কাল প্রতি ট্রিপে কমে যাবে গড়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা। এছাড়া সেতুটি এশিয়ান হাইওয়ে রুট-১-এর একটি অংশ হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য উন্নয়নের দ্বার খুলে দিয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশকে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি সাব-রুটে রূপান্তরিত করবে।









