X
বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
৩ বৈশাখ ১৪৩১

পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ভারতেই তীব্র হচ্ছে ক্ষোভ

রঞ্জন বসু, দিল্লি
২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২:০০আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২:০০

দিনপনেরো আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আচমকাই বিদেশে পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর শুধু প্রতিবেশী বাংলাদেশ বা নেপালেই তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়নি, ভারতের অভ্যন্তরেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছে। কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী, সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে এমনকি শাসক দল বিজেপি ও তাদের শরিক দলের শীর্ষ রাজনীতিবিদরাও কেন্দ্রের কাছে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আর্জি জানাচ্ছেন। 

মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে পেঁয়াজ চাষিরা কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, মহারাষ্ট্রে তো বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো রাজনৈতিক সংকট পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। 

আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামে রাশ টানতে গত ৮ ডিসেম্বর ভারত সব ধরনের পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এর আগে পেঁয়াজের রফতানি নিরুৎসাহিত করতে গত ২৮ অক্টোবর ভারত প্রতি টন ৮০০ ডলারের ‘ন্যূনতম রফতানি মূল্য’ও বেঁধে দিয়েছিল। অর্থাৎ এই দামের কমে কেউ ভারত থেকে বিদেশে পেঁয়াজ পাঠাতে পারবে না বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব ধরনের পেঁয়াজ পাঠানোই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে রাতারাতি পেঁয়াজের দাম কমে এসেছে ঠিকই – কিন্তু ভারতের কৃষিখাতের শক্তিশালী ‘অনিয়ন লবি’ এতে বেজায় চটেছেন। কারণটাও খুব সহজ, রফতানি বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের পেঁয়াজ চাষীরা তাদের পণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন না। এর জন্য মহারাষ্ট্রে ‘বিজেপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য’ও উঠেপড়ে লেগেছে ওই লবি।

ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ও ‘মান্ডি’ (পাইকারি বাজার) হলো মহারাষ্ট্রের নাসিকে। কেন্দ্রীয় সরকার পেঁয়াজের রফতানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর থেকেই সেই নাসিকের কাছে লাসালগাঁও, নন্দগাঁও, পিম্পলগাঁও, উমারানে ইত্যাদি স্থানে লাগাতার বিক্ষোভ হচ্ছে। পেঁয়াজ চাষিরা মুম্বাই-আগ্রা এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত তিন-চার জায়গায় অবরোধ করে রেখেছিলেন একটানা। দিনকয়েক আগে পুলিশ জোর করে সেই অবরোধ তুলে দিলেও কৃষকরা সুযোগ পেলেই আবার ট্রাক্টর নিয়ে হাইওয়ে আটকে বসে পড়ছেন। মান্ডিতে বেচাকেনাও অনেক কমে এসেছে।

নাগপুরে মহারাষ্ট্র বিধানসভার বাইরে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন বিরোধী এমএলএ-রা 

অনিয়ন ফার্মার্স আ্যসোসিয়েশনের সভাপতি এন এম সিদ্দেশ জানাচ্ছেন, ‘একান্ত বাধ্য হয়েই আমাদের এই রাস্তা বেছে নিতে হয়েছে। গত মাসেও নাসিকের মান্ডিতে ভালো মানের পেঁয়াজ কুইন্টাল-প্রতি (১০০ কেজিতে ১ কুইন্টাল) ৭০০০/৮০০০ রুপি, আর মাঝারি মানেরটা ৪৫০০/৬০০০ রুপিতে বিক্রি হচ্ছিল। সেই জায়গায় এখন সেগুলো বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ২০০০/২৫০০ আর ৮০০/১২০০ রুপিতে। কৃষকরা বিরাট ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’  

আর একটি বৃহৎ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য কর্নাটকেও ঠিক একই ধরনের ছবি দেখা যাচ্ছে। ওই রাজ্যের গাডাগ জেলায় হাজার হাজার পেঁয়াজ চাষি ইতোমধ্যেই তীব্র বিক্ষোভ দেখিয়েছেন।

কর্নাটকের হুবলি থেকে আলু-পেঁয়াজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা সেলিম বাইহাট্টি বাংলা ট্রিবিউনকে এদিন বলছিলেন, ‘পেঁয়াজের দাম যেভাবে পড়ে গেছে তাতে আমাদের কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না-হলে আগামী দিনে আমরা আরও বড় প্রতিবাদের পথে হাঁটব।’

পেঁয়াজ চাষিদের এই বিক্ষোভ আঁচ করেই মহারাষ্ট্রের দুই জন উপমুখ্যমন্ত্রী, বিজেপির দেবেন্দ্র ফাডনবিশ আর এনসিপি-র অজিত পাওয়ার গত সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) মুম্বাই থেকে তড়িঘড়ি দিল্লিতে ছুটে আসেন। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে দেখা করে তারা জানান, পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা না-তুললে রাজ্যে শাসক জোটকে ‘বড় রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হতে পারে’। 

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী একনাথ সিন্ধেও ইতোমধ্যে টেলিফোনে কথা বলেছেন দিল্লিতে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে (যার মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে)। সিন্ধেও তাকে অনুরোধ জানান, কৃষক আর সাধারণ ক্রেতা – উভয়ের স্বার্থরক্ষা করেই এ বিষয়ে দ্রুত একটি ‘সমাধান’ খুঁজে বার করা হোক। 

ভারতে পর্যবেক্ষকরা সবাই একবাক্যে বলছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে মাথায় রেখেই যে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ‘পেঁয়াজ’ ভারতে রাজনৈতিকভাবে অতি স্পর্শকাতর একটি কৃষিপণ্য – এবং পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণে সরকারের পতন হয়েছে, এদেশে তার অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে। সে কারণেই ভারতের প্রতিটি সরকার পেঁয়াজের বাড়তি দামকে ‘ভয়’ পায় এবং পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকলেই তারা সবার আগে রফতানিতে কোপ ফেলে। দেশে আগামী সাধারণ নির্বাচনের তিন-চার মাস আগে এবারও ঠিক একই জিনিস ঘটেছে।

মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতা ও উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ (ডাইনে) বিষয়টি নিয়ে দেখা করেন অমিত শাহ’র সঙ্গে (ফাইল ছবি)

কিন্তু তার জেরে মহারাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে ঘোলাটে হয়ে উঠেছে, তাতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের কপালেও এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। উত্তরপ্রদেশের পরই ভারতে সবচেয়ে বেশি লোকসভা আসন রয়েছে এই মহারাষ্ট্রে (৪৮টি)। ফলে এই রাজ্যটিকে উপেক্ষা করা কোনও দলের পক্ষেই সম্ভব নয়  এবং মহারাষ্ট্রের শক্তিশালী ‘অনিয়ন লবি’কে সন্তুষ্ট করতে কেন্দ্রকে যে কিছু একটা করতেই হবে, সেই লক্ষণও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

তাহলে কি আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও তার আগেই সেটা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা আছে? 

বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, দিল্লিতে এমন একটি পদস্থ সূত্র জানাচ্ছেন আগামী মাসেই (জানুয়ারি) এই সিদ্ধান্তটি আবার পর্যালোচনা করা হবে সেই সম্ভাবনা প্রবল। কারণ জানুয়ারির মধ্যেই সম্ভবত নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা ছাড় দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাবে।

বস্তুত দিল্লির খুচরা বাজারেও যে পেঁয়াজ গত মাসে ৮০/৯০ রুপি কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল, তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আজকের তারিখে দিল্লিতে অনলাইন অ্যামাজন গ্রসারিতে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫০ রুপিরও নিচে, আর সবজিওলার ভ্যানে তা পাওয়া যাচ্ছে ৪০/৪৫ রুপির মধ্যেই। বস্তুত ভারতের ক্রেতা সুরক্ষা বিভাগের সচিব রোহিত কুমার সিং ইতোমধ্যেই বার্তা সংস্থা পিটিআই-কে জানিয়েছেন জানুয়ারির মধ্যে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম ৪০ রুপি কেজিরও নিচে নেমে আসবে বলে তারা আশাবাদী।  

আজকের তারিখে দিল্লিতে অনলাইন অ্যামাজন গ্রসারিতে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫০ রুপিরও নিচে

দ্বিতীয় যে ফ্যাক্টরটি ভারতকে এ ব্যাপারে নতুন করে ভাবাচ্ছে, তা হল বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীদের দিক থেকে কূটনৈতিক চাপ।

বস্তুত এভাবে দুম করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের রফতানি নিষিদ্ধ করায় তাদের যে প্রবল অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক অতীতে সে কথা বারবার ভারতকে বলেছে। এমনকি গত মাসেও দিল্লি সফরে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ভারতকে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেছেন। এবারে বাংলাদেশ তো বটেই, সেই সঙ্গে ভারতীয় পেঁয়াজের আরেক প্রধান আমদানিকারক দেশ নেপালও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের অনুযোগ জানিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে।  

ভারতের ব্যবসায়ী সমিতিগুলোও বলছে, দিল্লি যদি পেঁয়াজ রফতানি নিয়ে বারবার একই জিনিস করে, তাহলে নেপাল বা বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে মিশর, তুরস্ক বা ইরানের মতো বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ কেনার রাস্তায় হাঁটবে। সে ক্ষেত্রে ভারত তাদের এতদিনের নির্ভরযোগ্য একটি বিরাট বাজার হারাবে। 

/এফএস/
সম্পর্কিত
ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ২৯ মাওবাদী নিহত
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নৌকাডুবিতে নিহত ৪
ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারিয়ে বাংলাদেশের মননের চমক
সর্বশেষ খবর
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
নারিনকে ছাপিয়ে বাটলার ঝড়ে রাজস্থানের অবিশ্বাস্য জয়
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনের উপায় কী
সর্বাধিক পঠিত
ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন: সবাই সব জেনেও ‘চুপ’
ঘরে বসে আয়ের প্রলোভন: সবাই সব জেনেও ‘চুপ’
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ১৩ জনের
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ১৩ জনের
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটে পর্যটকদের ভিড়
প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটে পর্যটকদের ভিড়