প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১৫ দিন অতিবাহিত হয়েছে। চলে গেছে পহেলা বৈশাখও। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাটকল শ্রমিকদের জন্য এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সোমবার দুপুরে হংকং গেছেন। ফিরবেন ২৭ এপ্রিল। কাজেই ৩০ এপ্রিলের মধ্যে এই টাকা ছাড়ের সম্ভবনা খুবই কম বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। এদিকে সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় খুলনাসহ দেশের অপরাপর শিল্পঞ্চলগুলো আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) কর্মকর্তারা।
গত ১১ এপ্রিল সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠকে আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বাবদ এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করার জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং ৩০০ কোটি টাকা পহেলা বৈশাখের জন্য যা ওই উৎসবের আগেই পরিশোধ করতে বলা হয়। বাকি ৩০০ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে পরিশোধের নির্দেশ দেন। এছাড়া কাঁচা পাট কেনার জন্য ২০০ কোটি টাকা এবং পাট শিল্পের উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেন। একইসঙ্গে পুরো বিষয়টি তদারকি করতে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
খুলনায় আন্দোলনরত শ্রমিকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৭টি পাটকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধ এবং পাট কেনার জন্য সরকার এই এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একইসঙ্গে পহেলা বৈশাখের আগেই বকেয়া মজুরির একটি অংশ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১১ এপ্রিল সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ এবং এর পরের দিন ১২ এপ্রিল মঙ্গলবার সচিবালয়ে শুরু হওয়া পাটকল শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক ও প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের বৈঠকে (যা ১৩ এপ্রিল বুধবারও চলে) রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের সব বকেয়া ২৫ এপ্রিল সোমবারের মধ্যে একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পুরো টাকা এখনও ছাড় করেনি। ২৫ এপ্রিল সোমবার পর্যন্ত মাত্র ২০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি টাকা ছাড়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাটকল শ্রমিকদের বেতন, প্রভিডেন্ড ফান্ড এবং গ্র্যাচ্যুয়িটি বাবদ মোট কত পাওনা তা সুনির্দিষ্ট করে চূড়ান্ত হিসাব পাঠাতে বলেছে। যা কিছুটা সময় সাপেক্ষ। এদিকে বিজেএমসি সূত্র জানায়, ১৩ এপ্রিল বুধবার সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রমাণিক এবং প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের সব বকেয়া আগামী ২৫ এপ্রিলের মধ্যে একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ওই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হলে শ্রমিকরা আবারও আন্দোলনে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১১ এপ্রিল পাটকল শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের জন্য এক হাজার কোটি টাকা ছাড়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর পাটমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিজ দফতরে সাংবাদিকদের বিষয়টি অবহিত করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু পাটকল শ্রমিকরা সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পরও তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করেননি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল সিবিএ-ননসিবিএ ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের কথা শুনেছি। তবে অর্থ ছাড় না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শ্রমিক নেতারা বলেছেন, টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে আমরা আত্মাহুতি দেবো, কিন্তু আন্দোলন থেকে সরে আসবো না। ৫ দফা দাবিতে খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকরা মিলে ধর্মঘটের পাশাপাশি ১২ ঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল সিবিএ, নন-সিবিএ ঐক্য পরিষদের ডাকে মিলের উৎপাদন বন্ধ করে পাটকলের ৩৫ হাজার শ্রমিক এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তখন স্ব-স্ব মিলের অ্যাকাউন্টে অর্থ না আসা পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা। চলমান সমস্যা নিরসনে পাট মন্ত্রণালয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পর কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়। পাটকল শ্রমিকদের টানা আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছিল খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো। এছাড়া খুলনা-যশোর মহাসড়ক এবং খুলনা-যশোর রেলপথ অবরোধের কারণে তখন হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছিলেন।
প্রসঙ্গত, পাট খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়, অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শ্রমিকদের জন্য মজুরি কমিশন বোর্ড গঠন, ১ জুলাই ২০১৩ ঘোষিত ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা প্রদান, শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ এবং সব পাওনা পরিশোধের দাবি আদায়ে ঐক্য পরিষদ সে সময়ে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে আসছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যথাসময়ে প্রতিটি মিলেই সরকারের বরাদদ্দকৃত অর্থ পৌঁছে যাবে। এছাড়া আগামী মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই যাতে মিলগুলো কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনতে পারে সেজন্যও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত অর্থ ছাড় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, পাটকল শ্রমিকদের পাওনাবাবদ একটি বড় অংশ পহেলা বৈশাখের আগেই পরিশোধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাকি অর্থও খুবই অল্প সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। ২৭টি পাটকল শ্রমিকদের গ্র্যাচ্যুয়িটি ও প্রভিডেন্ড ফান্ডের মোট পাওনা হিসাব করতেও তো কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। তাই হিসাব শেষে সব পাওনা একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে। এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার কোনও কারণ নাই বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।
আরও পড়ুন:
কলাবাগানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ২
ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে প্রথমবার পাঁচ নম্বরে বাংলাদেশ: পাপন
/এসআই/এএইচ/








