প্রবৃদ্ধি-বিনিয়োগ-রাজস্ব সব লক্ষ্যই চাপে: সিপিডি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১২ জুন ২০২৬, ১৩:৩০আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ১৩:৩০

অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর অঙ্গীকার এবং রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। তবে দেশের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করছে, বাজেটে নির্ধারিত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাই বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রফতানি সম্প্রসারণ কিংবা কর্মসংস্থান— সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সিপিডির ভাষায়, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি এখনও কয়েক বছরের সঞ্চিত সংকট কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, জ্বালানি সংকট এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। ফলে কেবল উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার, দক্ষ প্রশাসন এবং শক্তিশালী নীতিগত পদক্ষেপ।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ অন্যান্য গবেষক উপস্থিত ছিলেন।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সিপিডির মতে, এই লক্ষ্য অর্জনের পথ মোটেও সহজ নয়। কারণ চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতি পায়নি। শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ, আমদানি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

সিপিডি বলছে, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি ছাড়া এক বছরে প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের লাফ দেওয়া কঠিন হবে।

মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে সংশয়

নতুন বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু গত চার বছর ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

সিপিডির মতে, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমবে না। এর জন্য খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি সরবরাহ সচল রাখা এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সংস্থাটি মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বাজেটের প্রায় সব লক্ষ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিনিয়োগে বড় বাধা আস্থার সংকট

বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিপিডির বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জটিলতা, ডলারের বাজারে অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির মতে, কেবল কর ছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সিপিডি বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ের যে ধারা দেখা গেছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।

গবেষণা সংস্থাটির মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত দুর্বলতা, কর ফাঁকি, সীমিত করজাল এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আহরণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হবে।

তবে করজাল সম্প্রসারণ, জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে কর তথ্য সংযুক্তকরণ, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়তে পারে।

ব্যাংক ঋণনির্ভর বাজেটের ঝুঁকি

সিপিডির অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হলো বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা। সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থনীতিতে এটিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব বলা হয়।

গবেষণা সংস্থাটি মনে করে, ব্যাংকিং খাত এখনও খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতিতে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রফতানি ও কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ

সিপিডির মতে, রফতানি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ রফতানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি।

এছাড়া বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করছে সংস্থাটি। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে কর্মসংস্থানকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ইতিবাচক দিকও দেখছে সিপিডি

সমালোচনার পাশাপাশি বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে সিপিডি। কর কাঠামোর জন্য পাঁচ বছরের রোডম্যাপ, কর রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর সুবিধা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি।

তবে সিপিডির মতে, এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে অনেক ভালো নীতি ঘোষণার পরও বাস্তবায়ন দুর্বল থাকার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

বাস্তবায়নই হবে আসল চ্যালেঞ্জ

সিপিডির সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তুলে ধরেছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, রফতানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো অর্জন করতে হলে শুধু বাজেট ঘোষণাই যথেষ্ট নয়।

সংস্থাটির মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলেই কেবল বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নিতে পারে। না হলে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা।

/জিএম/আরকে/
সম্পর্কিত
অর্থমন্ত্রীর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন আজ
অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন শুক্রবার
রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখার দাবি
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে যৌথ টহল জোরদারে একমত ঢাকা-দিল্লি
সীমান্তে যৌথ টহল জোরদারে একমত ঢাকা-দিল্লি
বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সকল ম্যাচের ফলাফল
বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সকল ম্যাচের ফলাফল
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেক্সিকান রেড লুকে দ্যুতি ছড়ালেন সালমা হায়েক
বিশ্বকাপের মঞ্চে মেক্সিকান রেড লুকে দ্যুতি ছড়ালেন সালমা হায়েক
চোটে বিশ্বকাপ শেষ জাপান অধিনায়কের, তারপর অবসর ঘোষণা
চোটে বিশ্বকাপ শেষ জাপান অধিনায়কের, তারপর অবসর ঘোষণা
সর্বাধিক পঠিত
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল, কার কত বেতন
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
পেনশনের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুয়িটি পাবেন বেসরকারি চাকরিজীবীরা
সংসদ নির্বাচনে ২৭ হাজার ভোটে পরাজিত বিএনপি নেতা পেলেন নতুন দায়িত্ব
সংসদ নির্বাচনে ২৭ হাজার ভোটে পরাজিত বিএনপি নেতা পেলেন নতুন দায়িত্ব
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
ভাইকে দেখে কাঁদতে শুরু করেন সেই বৃদ্ধ, ভারতে গেলেন কীভাবে
ভাইকে দেখে কাঁদতে শুরু করেন সেই বৃদ্ধ, ভারতে গেলেন কীভাবে