দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক, গ্রাহকদের বিক্ষোভ, ব্যাপক অঙ্কের আমানত উত্তোলন এবং তারল্য সংকট— সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যা শুধু একটি ব্যাংকের নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অবশেষে রবিবার (১৪ জুন) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপকে অনেকেই দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
আড়াই হাজার কোটি টাকা নয়, প্রয়োজন ছিল আস্থা
সংকটের শুরু থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল— ইসলামী ব্যাংকের সমস্যা মূলত তারল্যের নয়, আস্থার।
বাংলাদেশ ব্যাংক রবিবার সকালে ব্যাংকটিকে বিশেষ সহায়তা হিসেবে আড়াই হাজার কোটি টাকা দেয়। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের বড় একটি অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে শুধুমাত্র অর্থ সহায়তা দিয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
গ্রাহকদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন, বিতর্কিত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে অপসারণ না করা হলে তারা ব্যাংকে ফিরে যাবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন গ্রাহক ফোরাম এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্যে একই সুর শোনা যায়। অনেকেই মন্তব্য করেন, “আড়াই হাজার কোটি টাকা কেন, ৫০ হাজার কোটি টাকা দিলেও আস্থা না ফিরলে ইসলামী ব্যাংক স্বাভাবিক হতে পারবে না।”
বাস্তবে গত কয়েক দিনে ব্যাপক পরিমাণে আমানত উত্তোলনই সেই বার্তা দিয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে। এটিএম, অনলাইন ব্যাংকিং, আরটিজিএস ও বিভিন্ন লেনদেন সেবায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।
গ্রাহকদের বার্তা বুঝেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি গ্রাহকদের মনোভাবকে গুরুত্ব দিয়েছে।
খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান করার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কও তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ নামে সংগঠিত হওয়া গ্রাহকদের একটি অংশ সাত দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভও হয়।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিষয়টি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। ব্যাংকটির সংকট অন্য ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু চেয়ারম্যানকে সরিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করেছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যত স্বীকার করেছে যে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নেতৃত্ব ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট।
এস আলম অধ্যায়ের দীর্ঘ ছায়া
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে সাম্প্রতিক ঘটনার পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইতিহাস।
২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এস আলম গ্রুপের হাতে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শন ও তদন্তে উঠে আসে যে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু এস আলম গ্রুপের নামে ও বেনামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এই ঋণের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থ ব্যবহার করেই এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের সংবেদনশীলতা কাজ করছে।
সরকার এস আলম গ্রুপের শেয়ার জব্দ করেছে। অনেকের মতে, এখন সময় এসেছে এসব শেয়ারকে ব্যাংকের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে নতুন মালিকানা কাঠামো নিয়ে ভাবার।
সক্রিয় সচেতন গ্রাহক ফোরাম
এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি গ্রাহকদের স্বার্থ ও ব্যাংকিং খাতে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ে মতামত তুলে ধরতে সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে সচেতন গ্রাহক ফোরাম।
সংবাদ সম্মেলনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের নেতৃবৃন্দ ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সংগঠনের অবস্থান, গ্রাহকদের উদ্বেগ এবং প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।
কেন ইসলামী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত, দেশের সর্ববৃহৎ রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং শিল্প খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকটির গুরুত্ব অন্য যেকোনও ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি।
দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লাখো প্রবাসী তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পাঠান। গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প খাতের সঙ্গেও ব্যাংকটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
এই কারণে ইসলামী ব্যাংকে আস্থাহীনতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
নতুন দায়িত্বে জহির হোসেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা, তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমেই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত যোগাযোগ। গ্রাহকদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে তাদের আমানত নিরাপদ এবং ব্যাংকটি স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক নিয়োগ নয়, পেশাদার নেতৃত্ব প্রয়োজন
ব্যাংক খাত নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবার বলা হয়েছে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাদার ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই প্রয়োজনীয়তাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ব্যক্তিদের পরিচালনা পর্ষদে আনা উচিত নয় যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার বা বিতর্কিত গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কারণ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনও সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা
ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন, তারল্য কিংবা প্রযুক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আস্থা। একবার সেই আস্থা নষ্ট হলে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তাও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকবান্ধব পরিচালনা ব্যবস্থা।
কারণ একটি বিষয় এখন স্পষ্ট— ইসলামী ব্যাংক দুর্বল হলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, কেঁপে উঠতে পারে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত। আর ইসলামী ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে সেটি হতে পারে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের একটি নতুন সূচনা।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হুসাইন মনে করেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। তার ভাষায়, “এই প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের কোটি মানুষের আস্থা, প্রবাসীদের স্বপ্ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানতভিত্তি, শিল্প খাতে বৃহৎ বিনিয়োগ এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণেও ব্যাংকটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।”
আলতাফ হুসাইন বলেন, “ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের আস্থা। কোনও ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে, কারণ দেশের লাখো পরিবার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসীর আর্থিক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত।”
তিনি আরও বলেন, “ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ব্যাংকটির বিষয়ে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত হবে না, যা গ্রাহকদের মধ্যে অযৌক্তিক উদ্বেগ বা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।”
/এসটি/









