অননুমোদিত অনলাইন ঋণ অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত সব ধরনের লেনদেন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে গুগল প্লে স্টোরসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুমোদনহীন ঋণদাতা অ্যাপ অপসারণ এবং এসব অ্যাপের সেবা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় কিছু অননুমোদিত অ্যাপ চড়া সুদে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এসব অ্যাপ গ্রাহকের অজান্তে মোবাইল ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট, খুদে বার্তা, ছবি, ভিডিওসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছে। পরে নির্ধারিত সময়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে এসব তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহককে ব্ল্যাকমেল, হুমকি ও হয়রানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েও গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যাংক-মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন বন্ধ
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন, ২০২৪-এর ১৫(২) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া কোনও প্ল্যাটফর্মে তহবিল সংগ্রহ, ঋণ প্রদান বা অর্থ লেনদেন করা বেআইনি। এ নিয়ম লঙ্ঘন করে পরিচালিত ঋণ প্রদান কার্যক্রম একই আইনের ৩৭(১) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ কারণে অনুমোদিত ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অননুমোদিত ঋণ অ্যাপের সঙ্গে কোনও ধরনের লেনদেন না করতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও সতর্ক করেছে, অনুমোদিত কোনও ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান যদি এসব অননুমোদিত অ্যাপকে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে সেবা দেয়, তাহলে তাদের অপরাধের সহায়ক চ্যানেল বা সহযোগী হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। ফলে এসব অ্যাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট ও লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ করতে বলা হয়েছে।
বিএফআইইউর তালিকায় ৩১ অবৈধ অ্যাপ
এর আগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অননুমোদিত অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ না করতে জনগণকে সতর্ক করে। সংস্থাটি ডেটা চুরি, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্তত ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপ চিহ্নিত করেছে।
বিএফআইইউর নজরে আসা অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকানাও।
এসব অ্যাপের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মুঠোফোনে ঋণের নামে তথ্য চুরি
অননুমোদিত ঋণ অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ পাওয়ার প্রলোভনে পড়ে গ্রাহকেরা একদিকে উচ্চ সুদ ও নানা ধরনের চার্জের ফাঁদে পড়ছেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অ্যাপ ব্যবহারের সময় গ্রাহকের কাছ থেকে মোবাইলের কনট্যাক্ট লিস্ট, ছবি, ভিডিও ও খুদে বার্তায় প্রবেশের অনুমতি নেওয়া হচ্ছে। ঋণ পরিশোধে দেরি হলে এসব তথ্য ব্যবহার করে গ্রাহক ও তাঁর পরিচিতজনদের কাছে অপমানজনক বার্তা পাঠানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশের ফলে অনুমোদনহীন ঋণ অ্যাপগুলো যাতে ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবার অবকাঠামো ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ বা বিতরণ করতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়বে।









