দেশে নতুন ধরনের ব্যাংকিং সেবার দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। শাখা থাকবে না, থাকবে না নিজস্ব এটিএম বা নগদ জমা দেওয়ার মেশিনও। হিসাব খোলা থেকে শুরু করে ঋণ নেওয়া, টাকা পাঠানো কিংবা অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা—সবকিছুই হবে মোবাইল ফোন বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে চারটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার পর দেশে এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককেও লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
নতুন অনুমোদন পাওয়া চার ব্যাংক হলো—ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, নোভা ডিজিটাল ব্যাংক এবং বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক। উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছে ভুটানের ডিকে ব্যাংক, বিকাশের শেয়ারধারীরা, বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ এবং রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা লিমিটেড।
ব্যাংকে যেতে হবে না
গতানুগতিক ব্যাংকের সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো—এ ব্যাংকের কোনো শাখা থাকবে না। গ্রাহককে হিসাব খোলা, টাকা জমা বা উত্তোলন, ঋণের আবেদন কিংবা অন্য কোনও সেবা নিতে ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে না।
মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টাই ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাবে। ভার্চ্যুয়াল কার্ড, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। নগদ টাকা উত্তোলন বা অন্যান্য প্রয়োজনে গ্রাহক অন্য ব্যাংকের এটিএম ও এজেন্ট সেবা ব্যবহার করতে পারবেন।
অর্থাৎ প্রচলিত ব্যাংকের মতো ভবন, শাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এটিএমের বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে না। ফলে পরিচালন ব্যয়ও তুলনামূলক কম হওয়ার কথা।
একেকটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনে ন্যূনতম মূলধন লাগবে ৩০০ কোটি টাকা।
বিকাশ-নগদের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়
দেশে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা চালু রয়েছে। ফলে অনেকের কাছে প্রশ্ন—ডিজিটাল ব্যাংক আর মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে পার্থক্য কী?
মূল পার্থক্য হলো, মোবাইল আর্থিক সেবা মূলত টাকা পাঠানো, গ্রহণ, বিল পরিশোধসহ নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম। অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংক হবে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক। অর্থাৎ আমানত গ্রহণ, ঋণ দেওয়া এবং ব্যাংকিংয়ের অন্যান্য অনুমোদিত সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে পারবে
ডিজিটাল ব্যাংকের বড় একটি লক্ষ্য হলো, ছোট উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা।
নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক বড় বা মাঝারি শিল্পে ঋণ দিতে পারবে না। তবে কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ব্যবসার উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
দেশের বিপুলসংখ্যক ছোট ব্যবসায়ী এখনও ব্যাংকের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ঋণ, সমিতি বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। তাদের কাছে সহজে ঋণ পৌঁছে দিতে পারলে ডিজিটাল ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তার ব্যাংকে গিয়ে ঋণের আবেদন করার সুযোগ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার সক্ষমতা কম, তাদের জন্য অনলাইনে আবেদন ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংক কোনও ঋণপত্র বা এলসি খুলতে পারবে না।
জামানত ছাড়াই ঋণের সুযোগ
ডিজিটাল ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় গ্রাহক বাছাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় জামানতবিহীন ঋণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রচলিত ব্যাংকের মতো জমি, ভবন বা অন্য সম্পদ বন্ধক দেওয়ার সক্ষমতা নেই—এমন ছোট উদ্যোক্তারাও ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই, ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য কতটা কাজে আসবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, মূলধন সংরক্ষণের চাপ এবং ভৌত অবকাঠামোর ব্যয়ের কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা দেশের অনেক প্রান্তিক মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
তার মতে, শাখাবিহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো—যাদের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কতজনের হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের পাশাপাশি এসব মানুষের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
পাঁচ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে আসতে হবে
ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জন্য পুঁজিবাজারে আসার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে যেতে হবে।
আইপিওর পরিমাণ হতে হবে উদ্যোক্তা বা স্পনসরের প্রাথমিক অবদানের ন্যূনতম পরিমাণের সমান।
ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বিশেষ শর্ত রয়েছে। উদ্যোক্তাদের অর্ধেকের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, উদীয়মান প্রযুক্তি, সাইবার আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বাকি অর্ধেকের ব্যাংকিং, ই-কমার্স এবং ব্যাংকিং আইন ও বিধিবিধান বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
নিয়ন্ত্রণে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক
শাখা না থাকলেও ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে না। প্রচলিত ব্যাংকের মতোই এ ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমা সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ অনুপাত (এসএলআর) বজায় রাখতে হবে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি ও সেবা দেওয়ার ধরন আলাদা হলেও আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংককে প্রচলিত ব্যাংকের মতোই নিয়ম মানতে হবে।
সব মিলিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকের মূল পরিবর্তনটি ব্যাংকের ভবনে নয়, ব্যাংকিং সেবার ধরনে। গ্রাহককে ব্যাংকের কাছে না গিয়ে ব্যাংককেই গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়াই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তি ও অ্যাপের ওপর নয়—গ্রাহকের আস্থা, তথ্যের নিরাপত্তা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, সেবার মান এবং দেশের প্রান্তিক মানুষের ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সক্ষমতার ওপরও।