জঙ্গি অর্থায়ন ও অর্থ পাচারের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতি অসন্তুষ্ট এপিজি

গোলাম মওলা
০৬ মে ২০১৬, ০৪:৫৪আপডেট : ০৬ মে ২০১৬, ০৭:০৭

অর্থ পাচারের প্রতীকী ছবি অর্থ পাচার ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন না থাকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) প্রতিনিধি দল। এপিজি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে টানা ১৬টি বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বৈঠকগুলোতে বারবার উঠে এসেছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ও জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে বা জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার জন্য এপিজির ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এখন ঢাকায় অবস্থান করছে। এপিজি হচ্ছে ‘অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন’ বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণকারী এশিয়া অঞ্চলের সংস্থা। এপিজির কর্মকর্তা ডেভিড শেননের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে। বৃহস্পতিবার রাতে এপিজির প্রতিনিধি দল ঢাকা ত্যাগ করবে।

এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউয়ের মহা-ব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গেল কয়েক দিনে তারা (এপিজি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা) আমাদের সঙ্গে ১৬টি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আমরা তথ্য দিয়ে আমাদের অভিমত তুলে ধরেছি। তারা সেগুলোকে আরও ভালো করতে বলেছেন। তিনি বলেন, তারা সন্তুষ্ট কিনা, জানি না। তবে, বাংলাদেশের কাছ থেকে যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত চেয়েছিলেন, আমরা তাদের সেই ধরনের তথ্যই সরবরাহ করেছি। ৪ ধাপে আমরা অনেক তথ্য সরবরাহ করেছি। এ কারণে আমরা আশাবাদী, বাংলাদেশ হয়তো ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় যাবে না।

 দেবপ্রসাদ দেবনাথ আরও বলেন, এপিজি এখন যেসব তথ্য আমাদের কাছ থেকে নিয়েছে, তার প্রভাব পড়বে আগামী জুলাই মাসে প্রকাশিতব্য পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টে।

এপিজি হচ্ছে ‘অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন’ বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণকারী এশিয়া অঞ্চলের সংস্থা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১ দেশ এর সদস্য। এপিজি প্রতিনিধিদল সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে থাকে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সংস্থাটি প্রথম মূল্যায়ন করে। এরপর বাংলাদেশ নিয়ে ২০০৮ সালে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমে খুব বেশি সফলতা দেখাতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশকে কালো তালিকার আগের ধাপ ‘ধূসর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সেখান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অক্টোবরে মূল্যায়ন করে গেছে এপিজি। ২০১৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: সরকারের আগ্রহে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পেলেন চার পরিচালক

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত অক্টোবরে এপিজির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সক্ষমতার বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে গেছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সক্ষমতার মূল্যয়নের রিপোর্ট তৈরি করার জন্য তারা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছেন। এটি মূলত ‘ফোর্থ ড্রাফট ইভালুয়েশন’ বৈঠক।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি প্রকাশিত এপিজির খসড়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংক্রান্ত যে ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদন ও কৌশলপত্র তৈরি করেছে, তাতে সন্ত্রাসে অর্থায়নকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি বলেও জানিয়েছে এপিজি। একইসঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের দালিলিক কোনও কৌশলপত্র নেই বলেও এপিজি তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

এপিজির এই সর্তকতার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এপিজির তৃতীয় পর্বের খসড়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন-সংক্রান্ত ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে বাংলাদেশ একটি বাদে সবগুলোতে নিম্ন ও মধ্যম মানে রয়েছে।

আরও পড়ুন: ভিসার ‘ই-টোকেন’ পদ্ধতিতে সংস্কার করবে ভারত

বাংলাদেশ ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আইসিআরজি প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে এফএটিএফ পূর্ণভাবে বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতও এফএটিএফভুক্ত দেশ।  প্রচলিত সাধারণ নিয়মে বিশ্বের কোনও দেশ আইসিআরজি প্রক্রিয়াভুক্ত থাকলে আন্তর্জাতিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেই দেশটির ঋণপত্র বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় চলে গেলে বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। অভ্যন্তরীণ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পারে। 

জানা গেছে, গেল ৪ দিনের বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কর্মকর্তারা ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর রাজী হাসান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন: সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর এখন নৌপরিবহন অধিদফতর

সূত্র জানায়, এপিজির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে শুধু আইনি কাঠামো প্রস্তুত করাকে ভালো বললেও আইনি কাঠামোর প্রয়োগের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চেয়েছে এপিজি। এর বাইরে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলে এপিজি।

আইনকানুন তৈরিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও এর বাস্তবায়ন করতে পারছে না। অর্থ পাচার অব্যাহতভাবে বাড়ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা টাকার অংকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪০ কোটি। শুধু তাই নয়,  বিশ্বের মধ্যে অবৈধ পাচারের ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৬তম।

বিএফআইইউয়ের মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ জানান, আগামী জুলাইয়ে এপিজির বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর এই সময়ের মধ্যে ন্যূনতম আরও দুটি মানদণ্ডে উন্নতি করতে পারলে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকাভুক্ত হতে হবে না বাংলাদেশ।

/এমএনএইচ/

/আপ-এএ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি