লবণের বাজারের অস্থিরতার ঢেউ লেগেছে কাঁচা চামড়ার বাজারেও। সবচেয়ে কম দামে চামড়া কিনেও লোকসানের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, চামড়া কিনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকার পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা যে দাম দিয়ে চামড়া কিনেছেন, ট্যানারির মালিকরা ও আড়ৎদারেরা তার চেয়েও কমদামে কিনতে চাইছেন। এ কারণে অধিকাংশ চামড়া এখনও ঢাকার বাইরেই রয়ে গেছে। এ অবস্থা বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চামড়া পাচার হওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, ট্যানারিগুলোতে কোনও নতুন চামড়া আসছে না। অধিকাংশ ট্যানারির মূল ফটক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বুধবার হাতেগোনা যে কয়েকটি ট্রাক কাঁচা চামড়া নিয়ে এসেছে, এগুলোর অধিকাংশই হাজারীবাগের আশপাশের এলাকার। বুধবার বিকেলে কেবলমাত্র সিলেট থেকে একটি ট্রাক চামড়া নিয়ে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে ইস্ট-এশিয়া ট্যানারিজের কর্মচারী রবিন জানান, অন্যান্য বছর কোরবানির ঈদের পরের দিন এখানে সকাল থেকে কাঁচা চামড়ার ট্রাকের লাইন পড়ে যায়। কিন্তু এ বছর চামড়া আসছে না। চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণে ঢাকায় চামড়া আসছে না বলে মনে করেন তিনি।
তিনি জানান, এছাড়া লবণের দাম বেশি হওয়াতে পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।
এদিকে, হাজারীবাগে বিভিন্ন ট্যানারি ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কিছু ট্যানারি তাদের প্রধান ফটক বন্ধ করে রেখেছে। এর মধ্যে বে-ট্যানারিজ লিমিটেড অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান গেট বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, লোকসান এড়াতে এবারের কোরবানির ঈদে পশুর চামড়া তাদের প্রতিষ্ঠান কিনবে না। শুধু বে-ট্যানারিজই নয়, হাজারীবাগের অর্ধশতাধিক ট্যানারির মালিক এখন পর্যন্ত ঈদে জবাই হওয়া পশুর চামড়া কেনা থেকে বিরত রয়েছে।
অপরদিকে, ঢাকার বাইরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া কিনেছেন, তাদের সেই চামড়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাবেন কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, এবার ফড়িয়াদের অনেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেশিদামে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী বেশিদাম দিয়ে ফড়িয়াদের কাছ থেকে চামড়া কিনেছেন। এক্ষেত্রে কারও কারও কাঁচা চামড়ার বর্গফুট প্রতি দাম পড়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এরপর লবণ এবং শ্রমিক মজুরি মিলে আরও ৮ টাকা বর্গফুটপ্রতি খরচ করতে হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই, পূর্বনির্ধারিত প্রতি বর্গফুটের দাম ৪৫ টাকার বেশিও পড়েছে।
জানা গেছে, চামড়ার দাম কমে যাওয়ার কারণে অনেকে ঢাকায় চামড়া আনা থেকে বিরত থাকছেন। অনেকেই স্থানীয় বিভিন্ন আড়তে লবণ মেখে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চট্টগ্রামসহ সারাদেশের পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহে স্থানীয় আড়ৎগুলোতে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু করেছেন।
৯ সেপ্টেম্বর চামড়া ব্যবসায়ীদের তিন সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ হাইড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, ৪০ টাকা। আর ঢাকার ভেতরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা।
চামড়া ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ বছরের কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ গতবারের চেয়ে ৫ থেকে ১০ ভাগ কম হতে পারে। ভারতীয় গরুর সরবরাহ কম থাকায় ও বন্যার কারণে দেশে গরু কোরবানি কম হওয়াকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এবারের ঈদে প্রায় ১ কোটি চামড়া সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ট্যানারি ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, পুরান ঢাকার পোস্ত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এই এলাকায় চামড়া নিয়ে এসে বিপাকে পড়েছেন শত শত পাইকারি ব্যবসায়ী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফড়িয়া বা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা কাঁচা চামড়া নিয়ে এসেছেন। মিনিট্রাকে করে বাসাবো এলাকা থেকে পোস্ত এলাকায় ১ হাজার ১শ চামড়া নিয়ে এসেছিলেন কামরুল নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি চামড়ায় গড়ে মাত্র ৫০ টাকা লাভ রেখে আড়ৎদারকে দিয়ে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতি পিস গড়ে ১২শ টাকা বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, রাজধানীর পোস্ত কাঁচা চামড়ার সবচেয়ে বড় বাজার। শায়েস্তা খাঁ রোড থেকে শুরু হয়েছে এই বাজার। চামড়া ব্যবসায়ীরা ভ্যানে করে চামড়া নিয়ে এসে পাইকারি দরে চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারদের চামড়া কেনার জন্য অনুরোধ করছেন। কিন্তু তারা যে দামে কিনেছেন, তার চেয়ে কম দাম বলার কারণে চামড়ার ভ্যান নিয়ে তাদের এদিক-ওদিক ঘুরতে দেখা গেছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আসা সালাম জানান, যে দামে এবার চামড়া কেনা হয়েছে, তার চেয়েও কম দাম বলছে আড়ৎদাররা। তবে পোস্ত এলাকার আড়ৎদারদের দাবি, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনে তারা যাতে লোকসানে না পড়েন, সে কারণে বুঝেশুনে তারা চামড়া কিনছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন লবণের দাম বেশি। লেবারের দামও বেশি। সবকিছু মিলিয়ে আমরা বুঝেশুনে চামড়া কিনছি।’ তিনি বলেন, ‘ঈদের এক সপ্তাহ আগে ট্যানারি মালিকদের দুই সমিতি ও চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেই দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ কিনলে তার দায় তাকেই নিতে হবে।’
/জিএম/এবি/
আরও পড়ুন
চামড়া বিক্রির চার ধাপ








