৪৭ বছরেও নেই স্বর্ণ আমদানির নীতিমালা, অপেক্ষার শেষ কবে?

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১১:০৮, মার্চ ২৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, মার্চ ৩১, ২০১৮

বাংলাদেশের স্বর্ণবাজার পর্ব-৩

প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী— সারাদেশে চলছে স্বর্ণের ব্যবসা। সরকার এই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ভ্যাট-ট্যাক্সও নিচ্ছে। কিন্তু স্বর্ণের বৈধ উৎস নেই। চাহিদার সিংহভাগই আসছে চোরাচালানের স্বর্ণ থেকে। ৪৭ বছরেও হয়নি স্বর্ণ আমদানির নীতিমালা। আর নীতিমালা না থাকায় এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অবশ্য এ অর্থবছরের বাজেটে একটি যুগোপযোগী ‘জাতীয় স্বর্ণ নীতিমালা’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে এ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

এ প্রসঙ্গে জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি গঙ্গাচরণ মালাকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এতদিন স্বর্ণের উৎস সম্পর্কে আমাদের কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। এর ফলে অনেকেই কমবেশি সুবিধা নিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘স্বর্ণের উৎস না জেনেই এতদিন আমাদের কাছ থেকে ভ্যাট নেওয়া হয়েছে, আয়করও নেওয়া হয়েছে। আমরাও চাই বৈধতা। আমরাও চাই বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি করতে। ৪৭ বছর ধরে আমরা বৈধতা চাচ্ছি।’

বিশিষ্ট এই ব্যবসায়ী বলেন, “স্বর্ণ আমদানির সুযোগ চেয়ে আমরা সরকারের কাছে বারবার গিয়েছি। ২০ বছর ধরে আমরা ‘স্বর্ণ নীতিমালা’ চাচ্ছি। আশা করছি এই অর্থবছরেই নীতিমালা হয়ে যাবে।"

সর্বশেষ ৪ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।

জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলিপ কুমার আগারওয়ালা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠন থেকে গত ৪৮ বছর ধরে স্বর্ণ আমদানির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। আমরা বলছি, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা স্বর্ণ এনে একটা প্রিমিয়াম যুক্ত করে ব্যবসায়ীদের দিক অথবা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হোক। ডিলারের মাধ্যমেও এনে আমাদের দেওয়া যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমি স্বর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি পাইনি। এর আগে প্রধান আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নেওয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি নেওয়ার পর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলেও কাজ হয়নি।’

তবে দেশে বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আমদানি নীতি আদেশ ২০০৯-২০১২-এর ২৫(২৩) উপ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,  ‘বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৪৭’-এর ধারা-৭-এর শর্তপূরণ সাপেক্ষে স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানি করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি লাগে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাগেজ রুলসের আওতায় ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বিনাশুল্কে এবং ২৩৪ গ্রাম স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিণ্ড প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে তিন হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করে আনতে পারেন যাত্রীরা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন, উচ্চ শুল্কসহ নানা জটিলতার অজুহাত তুলে ব্যবসায়ীরা বৈধপথে স্বর্ণ আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে চোরাই পথে আসা স্বর্ণেই মিটছে দেশের সিংহভাগ চাহিদা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক দেবাশিস চক্রবর্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৪৭ অনুযায়ী যথাযথ নিয়ম মেনে স্বর্ণ আমদানির সুযোগ আছে। কেউ যথাযথ নিয়ম মেনে এলসি করলে সেক্ষেত্রে জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি অথবা অনাপত্তি দেয়।’ তিনি জানান, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্য প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। এতে এলসি করার সময় পণ্যমূল্য নির্ধারণে সমস্যা হয়। আমদানির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট তথ্য এলসি ফরমে উল্লেখ না থাকলে অথবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক স্বর্ণ আমদানির জন্য এলসি খোলার অনুমতি দিতে পারে না।

জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে স্বর্ণ আমদানিযোগ্য পণ্য ছিল। তখনও স্বর্ণ আমদানি করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি লাগতো। কিন্তু তখন পুরো প্রক্রিয়া সহজ ছিল।

জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলিপ কুমার আগারওয়ালা জানান, ১৯৭১ সালের আগে দুজন ডিলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বর্ণ আমদানি করতো এবং পরে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতো। স্বাধীনতার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯৭১ সাল থেকে প্রবাসী কোটায় ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই বিমানবন্দরে ঘোষণা দিয়ে ১০ কেজি পর্যন্ত স্বর্ণ আনতে পারতো। ১৯৯৬ সালে এটা কমিয়ে পাঁচ কেজি পর্যন্ত আনার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০০০ সালে এটা আরও কমিয়ে দুই কেজি পর্যন্ত করা হয়। ২০১০ সালে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

দিলিপ কুমার আগারওয়ালা বলেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি কেজি স্বর্ণ আনতে ট্যারিফ হিসেবে সাড়ে ১২ হাজার টাকা সরকারকে দিতে হতো। কিন্তু ১৫-১৬ অর্থবছর থেকে প্রতি কেজিতে সরকারকে দিতে হয় তিন লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘যখন ট্যারিফ সাড়ে ১২ হাজার টাকা ছিল, তখন প্রতিদিন সরকার স্বর্ণ খাত থেকে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পেতো। কিন্তু যেদিন থেকে ট্যারিফ তিন লাখ টাকা করা হলো, সেদিন থেকে সরকার এই খাতে এক টাকাও পায় না। শুধু তা-ই নয়, ট্যারিফ বাড়ানোর ফলে দেশে স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে যায়।’

এদিকে বেসরকারি এক সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে ৩০ থেকে ৪০ টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। অথচ এই পরিমাণ স্বর্ণ কোথা থেকে আসছে এবং কারা এর জোগান দিচ্ছে—সবই থাকছে অস্বচ্ছ। বিক্রয়যোগ্য, প্রদর্শিত কিংবা ব্যবসায়ীদের সংরক্ষণে থাকা বেশিরভাগ মজুত স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের নিবন্ধনও নেই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, দেশে স্বর্ণের চাহিদার সিংহভাগ চোরাচালানের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে, যা ৯০ শতাংশের কম হবে না। যদিও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি গঙ্গাচরণ মালাকারের মতে, স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে সাত থেকে নয় টন। এই চাহিদার পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে স্বর্ণ আসছে চোরাচালান থেকে। গঙ্গাচরণ মালাকার জানিয়েছেন, ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম করে স্বর্ণ এনে তাদের কাছে বেচেন। বাকি স্বর্ণ দেশের অভ্যন্তরের পুরনো স্বর্ণ দিয়েই সামাল দিতে হয়। 

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বর্ণ ব্যবসা একধরনের অস্বচ্ছ ব্যবসা। এই শিল্পের ব্যবসায়ীরা চাহিদার একটা বড় অংশ ‘চোরাচালান থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে। এছাড়া ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম করে আনা স্বর্ণও সংগ্রহ করে। আসল কথা হলো, স্বর্ণের বাজারটা মূলত অস্বচ্ছ।’ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের উদ্যোগ ছাড়া এই খাতে স্বচ্ছতা আসবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সংখ্যা এক লাখ ২৮ হাজারের কাছাকাছি। এরমধ্যে ঢাকা শহরে স্বর্ণালঙ্কার ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১০ হাজারের মতো।

/এইচআই/টিএন/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ