শুধু কথায় নয়, এখানে আসার আগে বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা এবং এসে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখে বলতে চাই, বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘উড্ডয়ন’ মুহূর্তে রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের বুঝুক এখন উড্ডয়নের সময়। এ উচ্চাভিলাষ করার অধিকার এ দেশের মানুষের রয়েছে।
মঙ্গলবার ‘মিট দ্য প্রেস’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে ঘুরে ফিরে এ অভিমত ব্যক্ত করেন বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্ব ব্যাংক।
‘প্রথমবারের মতো বিশ্ব ব্যাংকের কোনো ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলা কথা বলছেন,’ এমন উক্তি দিয়ে বক্তব্য শুরু করে কৌশিক বসু বলেন, ২২ বছর পর বাংলাদেশে এসেছি। আসার আগের ৭ থেকে ৮ দিন আমাদের (বিশ্ব ব্যাংক) গবেষণা বিভাগের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলছি, বাংলাদেশ প্রচুর উন্নতি করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে জানাতে চাই, অর্থনৈতিক দিকে থেকে বাংলাদেশ এশিয়ার ব্যাঘ্র।
ঢাকার অদূরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ড দেখার পরের অভিমত বিষয়ে তিনি বলেন, যা দেখলাম তাতে পরিসংখ্যানের তুলনায় বেশি আশাবাদী আমি।
যদিও অনেক কাজ বাকি তথাপি তিনটি বিষয় তার নজর কেড়েছে উল্লেখ করে কৌশিক বুস বলেন, উদ্ভাবনমূলক চিন্তা ও প্রয়োগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সচেতনতা দেখে আমি মুগ্ধ।
তিনি বলেন, নিরাপদ ও উন্নত কর্ম পরিবেশের উদাহরণ টানার জন্য বিদেশ যাওয়ার দরকার নেই। বাংলাদেশই এমন উদাহরণ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, গত সাড়ে ৬ থেকে ৭ বছরে বিশ্ব মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হার বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি।
তিনি বলেন, আমার মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছি। মূল্যস্ফীতির হার ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখতে পারলে আমরা সন্তুষ্ট। এটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি।
গভর্নর বলেন, নিজেদেরকে উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করি। আর্থিক খাতের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে সরকারকে সহায়তা করি।
আতিউর রহমান আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে বলেন, তিনি (কৌশিক বসু) একটি উদ্ধাভাবনী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবেন বলে আশা করছি। যা থেকে অনেক দেশ শিখতে পারবে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলে মানুষের ভেতর আস্থা বাড়ছে। দেশের মানুষ ভাবছে, সরকার ও ব্যাক্তি খাত সবাই মিলে তাদের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে ‘ফিনানশিয়াল ডেমোক্রেসি’ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে কৌশিক বসু বলেন, দুইটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অপরটি আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমলাতন্ত্র আরও দক্ষ ও দ্রুত হতে হবে। পদ্ধতি ও অন্যান্য জটিলতা কমিয়ে ব্যবসার শুরুর সময় কমাতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নজরকাড়ার মতো অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বসু বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা সময়েও গত ৬ থেকে ৭ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। মাত্র ৫ থেকে ১০টি দেশের এমন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আগামী ৩ থেকে ৪ বছরে তা ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও চীনের প্রবৃদ্ধির মধ্যে চলতি বছর কার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়, এটি এখন দেখার বিষয় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে বসু বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে না বলে বাংলাদেশের মানুষকে বলবো, দেশের উন্নতি ধারাবাহিক রাখতে হলে, আপনাদের ভূমিকা রাখতে হবে।
বিনিয়োগ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জিডিপির ২৯ শতাংশ বিনিয়োগ ভালো। ৮% শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে এটিকে ৩৩ থেকে ৩৪ শতাংশে নিতে হবে। এ জন্য প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবেই, বিষয়টি এমনটি এমন নয়। দেশি বিনিয়োগ বাড়িয়েও এ লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে।
বর্তমান ধারা অনুসারে ওই পরিমাণ বিনিয়োগ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব, তবে এমন কথা বললে উৎসাহে ভাটা পড়তে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যা ঘটেছে তা এখন অতীত। বাংলাদেশ ও বিশ্ব ব্যাংক এখন থেকে অংশীদার হয়ে কাজ করবে।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি শুভ উদ্যোগ ও বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকে প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরুপাক্ষ পাল, বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধান মার্টিন রামা, প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরিন এ মাহবুব প্রমুখ।
/এফএইচ/








