চামড়ার দাম বিপর্যয়ের দায় কার?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:৪৫, আগস্ট ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৮, আগস্ট ০৯, ২০২০

(ফাইল ছবি)রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় এখনও পুরোপুরি কোরবানির পশুর চামড়া কেনা শুরু করেনি চামড়া ব্যবসায়ীরা। ক্রেতার অভাবে হাজার হাজার পিস কোরবানির পশুর চামড়া পোস্তার আনাচে কানাচে পড়ে আছে। সংরক্ষণের অভাবে পচন ধরেছে, দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ৮ আগস্ট থেকে চামড়া কেনা শুরু হয়েছে। চামড়ার গুণগত মান দেখে চামড়া কেনা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনা হচ্ছে। অপরদিকে বিক্রেতারা বলছেন, লবণ মাখিয়ে রাখার পরেও পোস্তার আড়ৎদাররা চামড়া কিনছেন না। নানা রকমের টালবাহানা করছে। অনেক আড়ৎদার বাকিতে চামড়া বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ উপায় না পেয়ে বাকিতেই চামড়া বিক্রি করেছেন।

রবিবার (৯ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পোস্তার রাস্তায় সারি সারি চামড়া বোঝাই ছোট-বড় ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ট্রাক থেকে চামড়া আড়তের সামনে নামিয়ে রাখা হয়েছে। ছোট-বড় মিলে আড়ইশ’ আড়ৎ রয়েছে পোস্তায়। কোরবানি করা অধিকাংশ পশুর চামড়া এখানে সংগ্রহ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এই পর্যন্ত পোস্তার আড়ৎদাররা চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করেছেন, এখনও করছেন। তবে কেনার গতি খুবই ধীর। এতে চামড়া নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মাণ খারাপ হচ্ছে। অনেকের চামড়ায় পচন ধরায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জানতে চাইলে চামড়া আড়ৎদার সমিতির নেতা আনোয়ার হোসেন জানান, গত ৮ আগস্ট থেকে চামড়া কেনা শুরু করেছি। নগদ টাকা হাতে না থাকায় সেভাবে কিনতে পারছি না। চামড়া কেনার জন্য ঋণও পাই না। ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নাই। ব্যাংক আমাদের ঋণ দেয় না। ব্যাংক ঋণ দেয় ট্যানারি মালিকদের। খুচরা পর্যায়ে কেনা চামড়া আমরা বিভিন্ন ট্যানারিতে সরবরাহ করি। ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের পাওনা টাকা এখনও পাইনি। ট্যানারি মালিকরা অনেকেই পাওনা টাকা পরিশোধে গড়িমসি করছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পেলে চামড়া কিনবো কী দিয়ে?

কোরবানির পশুর চামড়া কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করেই গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ২৯ শতাংশ দাম কমিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দর ঠিক করে দিয়েছিল। সেই দরে চামড়া কিনবেন- ব্যবসায়ীরা এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি। ঠিক করে দেওয়া দরে চামড়া তারা কেনেননি।

রাজধানীতে গরুর চামড়া আকার ভেদে প্রতিটি ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা, ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২ থেকে ১০ টাকায়। আর পোস্তার আড়ৎ মালিকরা ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় এসব চামড়া ক্রয় করেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ী বা মসজিদ মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। ঢাকার বাইরের চিত্রও একই ছিল বলে জানা গেছে। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা না বুঝে ব্যবসায় নামেন। এতেই বাধে বিপত্তি।

রাজধানীর শাহজাহানপুরের ঝিল মসজিদ সংলগ্ন নূরানী মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক মওলানা আজিজুল হক জানিয়েছেন, এ বছর চামড়া কম সংগ্রহ হয়েছে। এর ওপর আবার দাম কম। সময় মতো বিক্রি করতে না পারায় কিছু চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। ট্রাক ভাড়া করে পোস্তা নিয়ে গিয়ে বাকিতে বিক্রি করে এসেছি। এ ছাড়াতো উপায় নাই।

প্রসঙ্গত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৯ শতাংশ দাম কমিয়ে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর যা ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার দর ঠিক করে ২৮ থেকে ৩২ টাকা। গত বছর যা ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এক্ষেত্রে কমানো হয় প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম ধরা হয় ১৩ থেকে ১৫ টাকা, গত বছর যা ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। যা গত বছরের চেয়ে ২৭ শতাংশ কম। পাশাপশি বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ১০ থেকে ১২ টাকা। গত বছর ছিল ১৩ থেকে ১৫ টাকা, যা ২৩ শতাংশ কম।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী টিপু সুলতান জানিয়েছেন, গত বছরের চামড়া বেচার টাকা এখনও ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা রয়েছে। সেই টাকাগুলো পেলে ব্যবসা করা সহজ হতো। আমাদেরকে ব্যাংক ঋণ দেয় না। ফলে আমরা নগদ টাকার সংকটে রয়েছি। তাই হয়তো কিছুটা ধীর গতিতে চামড়া কিনছি। কারণ কেউ তো বাকিতে বিক্রি করতে চায় না। তারা নগদ টাকা চায়, তা দেবো কোথা থেকে? তারপরেও আমরা গতকাল ৮ আগস্ট থেকে কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করেছি। চামড়ার মাণ অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামেই আমরা লবণযুক্ত চামড়া কিনবো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহম্মদ শফিকুজ্জামান আবারও জানিয়েছেন, কাঁচা চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। যে কোনও মূল্যে এই সম্পদ রক্ষা করা হবে। এই বছর কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু রফতানির সুযোগ দিয়েছে সরকার, কারণ রফতানি খাতের পণ্য হিসেবে চামড়ার অপার সম্ভবনা রয়েছে।

মূলত চামড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্মের কারণে এবারও বিপর্যয় ঘটলো কোরবানির পশুর চামড়ার দামে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রীতিমতো পানির দরে বিক্রি হয়েছে চামড়া। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকে রাগে ক্ষোভে চামড়া মাটিতে পুতে ফেলেছেন। অনেকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন। অনেকে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় ফেলে রেখে গেছেন। এভাবেই নষ্ট হয়েছে এবং হচ্ছে জাতীয় সম্পদ চামড়া।

এদিকে কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে অভিযান পরিচালনা করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। শনিবার (৮ আগস্ট) থেকে আমিনবাজার এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়। এই সময় দেখা গেছে, ট্যানারিগুলো কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়া কেনা শুরু করেছে। সীমিত পরিসরে লবণযুক্ত চামড়া বিক্রিও শুরু হয়েছে।

/এনএস/

লাইভ

টপ