গ্রাহক ঠকানোর মহোৎসব (পর্ব ৩)

এজেন্টনির্ভর বিমা মডেল: কমিশনের লোভে পলিসি বিক্রি, ঝুঁকিতে গ্রাহকের সঞ্চয়

গোলাম মওলা
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:০০

জীবন বিমা পলিসি বিক্রির পুরো ব্যবস্থাই  দাঁড়িয়ে আছে কমিশননির্ভর এক বিকৃত কাঠামোর ওপর। প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের বড় অংশ কমিশন হিসেবে পাওয়ার লোভে এজেন্টরা বাস্তবতা আড়াল করে গ্রাহককে নানা প্রলোভনে ফেলছেন— যার পরিণতি হচ্ছে আজকের এই আস্থাহীনতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এজেন্টনির্ভর ব্যবসা মডেল বিমা খাতকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রথম কিস্তি আদায়ের পর অনেক এজেন্টের আগ্রহ কমে যায়। ফলে বহু পলিসি মাঝপথে তামাদি  হয়ে যায়। এতে গ্রাহক হারান তার সঞ্চয়, আর কোম্পানিগুলো দায়মুক্ত হয়ে যায়। ফলে বিমা সুরক্ষা নয়— অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয়েছে গ্রাহক ঠকানোর এক ধরনের বৈধ ব্যবস্থায়। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় পর্ব।

স্বীকৃত প্রলোভন

বিমা পলিসি বিক্রির ক্ষেত্রে অবেশিরভাগ কোম্পানি তাদের এজেন্টদের প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের ওপর তুলনামূলকভাবে বড় অঙ্কের কমিশন দেয়। এই কমিশন কাঠামোই মূলত বিক্রির ধরনকে বিকৃত করে তুলেছে। দ্রুত কমিশন নিশ্চিত করতে এজেন্টরা অপরিচিত গ্রাহকের চেয়ে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিতজনদের টার্গেট করেন—যাদের রাজি করানো তুলনামূলকভাবে সহজ এবং যাদের কাছ থেকে প্রশ্নও কম আসে।

অনেক এজেন্ট বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন প্রলোভন দেখান। কোথাও বলা হয়, বিমা অঙ্কের দ্বিগুণ টাকা নিশ্চিতভাবে ফেরত পাওয়া যাবে, কোথাও নির্দিষ্ট সময় পর ‘নিশ্চিত লাভ’-এর আশ্বাস দেওয়া হয়। অথচ বাস্তবতা হলো— এ ধরনের কোনও প্রতিশ্রুতি কোনও বিমা কোম্পানির পক্ষেই দেওয়া আইনগতভাবে সম্ভব নয়।

বিমা খাত নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ’র বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমার মধ্যে থেকেই মুনাফা ঘোষণা ও বণ্টন করতে হয়। মুনাফার হার নির্ভর করে কোম্পানির বিনিয়োগ আয়, আর্থিক অবস্থান ও অ্যাকচুয়ারিয়াল হিসাবের ওপর। ফলে আগেভাগেই নির্দিষ্ট অঙ্ক বা নির্দিষ্ট হারে মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়ার কোনও বৈধ সুযোগ নেই। তবু মাঠপর্যায়ে এই বাস্তবতা আড়াল করেই গ্রাহককে পলিসি কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এক্ষেত্রে সায় আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-রও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এজেন্ট ‘পরিচিত’ বলে তার কথায় ভরসা করে বিমা পলিসি কেনাই ভবিষ্যৎ ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে উঠছে। কারণ পলিসি বিক্রির সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, দাবি পরিশোধ বা মেয়াদ শেষে টাকা ফেরতের সময় তার কোনও লিখিত ভিত্তি থাকে না। পলিসি তামাদি হয়ে যাওয়া ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশিরভাগই এই ধরনের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়েছেন। কমিশনভিত্তিক পলিসি বিক্রির এই ফাঁদে পড়ে গ্রাহক শেষ পর্যন্ত নিজেকেই প্রতারিত করার দায় বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন— যার মাশুল গুনতে হচ্ছে বছরের পর বছর।

কমিশনের ফাঁদ: বিক্রি হলেই দায়িত্ব শেষ

জীবন বিমা পলিসি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের ওপর এজেন্টরা তুলনামূলকভাবে বড় অঙ্কের কমিশন পান। এই কমিশন কাঠামো পুরো ব্যবস্থাকে বিকৃত করে দিয়েছে।

পাবনার অষ্টমনিষা এলাকার সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, একক জীবন বিমা পলিসির ক্ষেত্রে প্রথম কিস্তির অর্ধেক অর্থ নগদে কোম্পানির কাছে জমা পড়ে। বাকি অর্ধেক অর্থ মাঠকর্মীদের কমিশন হিসেবে দেওয়া হয়। তবে দ্বিতীয় কিস্তি থেকে মাঠকর্মীদের কমিশন নির্ধারিত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না।

একই এলাকার পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাঠকর্মী হাসিনুর হোসেন জানান, আগে একক বিমা পলিসির ক্ষেত্রে প্রথম কিস্তির অর্ধেক অর্থ নগদে মাঠকর্মীরা পেতেন। অর্থাৎ বার্ষিক কিস্তি এক লাখ টাকা হলে, পলিসি খোলার দিনই কোম্পানির হিসাবে জমা পড়তো ৫০ হাজার টাকা এবং বাকি ৫০ হাজার টাকা নগদে মাঠকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। বর্তমানে এই কমিশন কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন প্রথম কিস্তি থেকে মাঠকর্মীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ শতাংশ। দ্বিতীয় কিস্তি থেকে নির্ধারিতভাবে ১০ হাজার টাকা কমিশন দেওয়া হয় এবং তৃতীয় কিস্তি থেকে শেষ কিস্তি পর্যন্ত ৭ শতাংশ হারে কমিশন পরিশোধের নিয়ম চালু রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পলিসি বিক্রির সময় বাস্তব ঝুঁকি গোপন রাখা হয়।

লিখিত শর্ত না বুঝিয়ে মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হয়। ‘১০ বছরে দ্বিগুণ টাকা’, ‘নিশ্চিত রিটার্ন’ ‘ঝুঁকি নেই’— এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে গ্রাহককে প্রলুব্ধ করা হয়।  কিন্তু আইন অনুযায়ী, বিমা কোম্পানি আগাম কোনও নির্দিষ্ট লাভ বা দ্বিগুণ ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ফলে পলিসি বিক্রির সময় যে আশ্বাস দেওয়া হয়, দাবি পরিশোধের সময় তার কোনও আইনি ভিত্তি থাকে না।

মাঠকর্মীর দায় গ্রাহকের ওপর

রাজশাহীর বাসিন্দা কল্পনা আক্তার জানান, ২০০৮ সালে তিনি হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে দুই লাখ ৮৮ হাজার টাকা পরিশোধ করে ১২ বছর মেয়াদি একটি জীবন বিমা পলিসি কেনেন। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালে পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও তিনি তার প্রাপ্য বিমাদাবির টাকা ফেরত পাননি।

কল্পনা আক্তারের অভিযোগ, বারবার কোম্পানির কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও তিনি কোনও সুনির্দিষ্ট সমাধান পাননি। কখনও বলা হয়েছে, নথিপত্র অসম্পূর্ণ, আবার কখনও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ‘পরবর্তীকালে জানানো হবে।’ এভাবে বছরের পর বছর ঘোরাঘুরি করেও তিনি তার সঞ্চিত অর্থ উদ্ধার করতে পারেননি।

এ বিষয়ে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের  এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মীর অনিয়মের কারণেই এ ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তার ভাষায়, “অনেক মাঠকর্মী গ্রাহকদের কাছ থেকে পলিসির টাকা গ্রহণ করে তা যথাসময়ে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে জমা দেন না, কিংবা বিক্রির তথ্য সঠিকভাবে রিপোর্ট করেন না। ফলে গ্রাহক যখন দাবি নিয়ে আসেন, তখন রেকর্ডে অসঙ্গতি দেখা দেয় এবং দাবি নিষ্পত্তি আটকে যায়।” অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে পলিসির টাকা গ্রহণ করে তা যথাসময়ে কোম্পানিতে জমা না দেওয়ার ঘটনা শুধু হোমল্যান্ডেই নয়, অনেক কোম্পানিতেই আছে।

মাঠকর্মীর হাতে আট বছর প্রিমিয়াম, নথিতে নেই পলিসি

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা নার্গিস আক্তার ১০ বছর মেয়াদি একটি জীবন বিমা পলিসি নিয়েছিলেন পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে। নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধের পর ২০২২ সালে তার পলিসির মেয়াদ শেষ হয়। তবে মেয়াদ উত্তীর্ণের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তিনি তার প্রাপ্য দাবি (ম্যাচুরিটি) টাকার কোনও খোঁজ পাননি।

পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পক্ষ থেকে নার্গিস আক্তারকে জানানো হয়েছে, তাদের রেকর্ডে তার নামে কোনও অর্থ জমা নেই। ফলে দাবি পরিশোধের প্রশ্নই ওঠে না। অথচ নার্গিসের দাবি— পলিসি করার পর থেকে টানা আট বছর তিনি নিয়মিত কিস্তির টাকা দিয়েছেন একই গ্রামের (ভবানীপুর) মাঠকর্মী ময়মনুল ইসলামকে, যিনি কোম্পানির অফিসে জমা দেওয়ার কথা বলে ওই অর্থ গ্রহণ করতেন।

জানা যায়, নার্গিসের নামে কোনও জমা না থাকায় শেষ দুই বছরের কিস্তির টাকা তিনি আর মাঠকর্মীকে দেননি। এতে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ আট বছর ধরে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই টাকা কোথায় গেল?

গত ২০ ডিসেম্বর মাঠকর্মী ময়মনুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। ফোনে আলাপকালে তিনি জানান, প্রায় ১৪-১৫ বছর আগে নার্গিস আক্তারকে তিনি ‘পপুলার প্রি-ডিপিএস’ পলিসি করিয়েছিলেন।  তার দাবি, ‘কিছু জমার স্লিপ হারিয়ে গেছে।’

নিজের দায় স্বীকার না করে উল্টো নার্গিস আক্তারকেই দায়ী করেন ময়মনুল। তার ভাষ্য, দুই কিস্তির টাকা বকেয়া থাকায় পলিসিটি তামাদি (ল্যাপস) হয়ে গেছে। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে— নার্গিসের নামে কোনও জমাই নেই, সেখানে বকেয়া থাকার প্রশ্নই আসে না।

ময়মনুল ইসলাম দাবি করেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি অফিসে আবেদন করে নার্গিস আক্তারের দাবির টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ নেবেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে টাকা না জমা দেওয়া, নথি হারানো এবং ভুক্তভোগীর অভিযোগ— সব মিলিয়ে তার এই আশ্বাস কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শাখায় কিস্তি জমা, হেড অফিসে পৌঁছায় না

পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির একটি শাখায় গ্রাহকের জমাকৃত কিস্তির অর্থ হেড অফিসে না পৌঁছানোর আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে। 

পাবনার ভাঙ্গুড়া শাখা থেকে ২০১৪ সালে ১৫ বছর মেয়াদি একটি জীবন বিমা পলিসি গ্রহণ করেন তানভীর স্বচ্ছ। পলিসি অনুযায়ী তিনি প্রতি বছর ৪০ হাজার ৪০৪ টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করে আসছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি মোট ১২টি কিস্তি পরিশোধ করেন। তবে ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় বিমা সার্ভারে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে তার নামে মাত্র ১০টি কিস্তি জমার তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ শাখা কার্যালয়ে নিয়মিতভাবে পরিশোধ করা দুটি কিস্তির মোট ৮০ হাজার ৮০৮ টাকা এখনও কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের হিসাবে যুক্ত হয়নি।

পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভাঙ্গুড়া শাখায় পলিসিটি খোলার সময় শাখা ব্যবস্থাপক ছিলেন মানিক হোসেন। আর্থিক কেলেঙ্কারি ও গ্রাহকের টাকা তসরুপের অভিযোগ ওঠার পর কয়েক বছর আগে মানিক হোসেনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তার দায়িত্বকালেই দুটি কিস্তির অর্থ হেড অফিসে জমা পড়েনি। তবে বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ থাকায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে ভাঙ্গুড়া শাখার দায়িত্বে রয়েছেন জাকির হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই পলিসিটি খোলা হয়েছে ও বেশিরভাগ কিস্তি জমা হয়েছে আমার যোগদানের আগের সময়ের। আমার দায়িত্বকালীন সময়ে এ ধরনের কোনও সমস্যা হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই ভালো বলতে পারবেন।” পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিএম ইউসুফ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিমা খাতে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে এবং এটি শুধু তাদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেশিরভাগ কোম্পানিতেই এমন ঘটনা দেখা যায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘কোনও মাঠকর্মী যদি গ্রাহকের প্রিমিয়ামের অর্থ আত্মসাৎ করেন, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিরই দায়িত্ব থাকে বিষয়টি সংশোধন করা এবং গ্রাহকের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া। পপুলার লাইফ ইন্সুরেন্স এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি গ্রাহকের সমস্যা সমাধান করে থাকে।’’

বিএম ইউসুফ আলী আরও বলেন, ‘‘একই ধরনের সমস্যা যদি অন্য কোনও গ্রাহকের ক্ষেত্রেও ঘটে থাকে, তাহলে কোম্পানিকে অবহিত করলে তা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

বিমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বহু ক্ষেত্রেই শাখা বা এজেন্ট পর্যায়ে কিস্তির অর্থ আদায় করা হলেও তা যথাসময়ে কেন্দ্রীয় হিসাব ব্যবস্থায় যুক্ত হয় না। ফলে গ্রাহক নিয়মিত টাকা পরিশোধ করলেও জাতীয় বিমা সার্ভারে তার পলিসি অনিয়মিত বা খেলাপি হিসেবে দেখায়।

এর ফলে গ্রাহক একদিকে যেমন- বোনাস ও মেয়াদপূর্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন, অপরদিকে মৃত্যু দাবি বা সারেন্ডার ভ্যালু পেতেও জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।

তদারকির ঘাটতি, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) জাতীয় বিমা সার্ভার চালু করলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত হয়নি। অনেক শাখায় এখনও ম্যানুয়াল রসিদ, দেরিতে অনলাইন আপডেট এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার সুযোগে অনিয়ম ঘটে থাকে।

তারা বলছেন, একটি শক্তিশালী রিয়েল-টাইম ডিজিটাল কালেকশন সিস্টেম চালু না থাকায় শাখা ও হেড অফিসের মধ্যে তথ্যের গ্যাপ থেকেই যাচ্ছে— যা অসাধু কর্মকর্তা ও এজেন্টদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।

কমিশনের লোভে পলিসি বিক্রি, ভোগান্তি গ্রাহকের

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাসিন্দা শিরিনা বেগম। স্থানীয় এক পরিচিত ব্যক্তির অনুরোধেই তিনি বায়রা লাইফে জীবন বিমা পলিসি কেনেন। ওই ব্যক্তি নিজেকে বিমা কোম্পানির ‘ডেভেলপমেন্ট অফিসার’ পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘‘এটি একটি ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’— যেখানে ১০ বছর পর জমা টাকার প্রায় দ্বিগুণ ফেরত পাওয়া যাবে।’’ পরিচিত মানুষ, তার ওপর দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্ক— তাই শিরিনা বেগম কোনও লিখিত হিসাব বা শর্ত না দেখেই রাজি হয়ে যান।

২০১৩ সালে তিনি ১০ বছর মেয়াদি একটি পলিসিতে বছরে ৩০ হাজার টাকা করে প্রিমিয়াম দেওয়া শুরু করেন। প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ হলেও পরে জানতে পারেন, তিনি যে লাভের হিসাব শুনেছিলেন, তা পলিসির কোথাও উল্লেখ নেই। বরং চুক্তিপত্রে স্পষ্ট লেখা— মুনাফা নির্ভর করবে কোম্পানির বিনিয়োগ আয়ের ওপর, নির্দিষ্ট কোনও অঙ্ক বা হার নিশ্চিত নয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৩ সালে পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর। দাবি জমা দিতে গিয়ে শিরিনা বেগম জানতে পারেন, তার পলিসিটি দুই বছর আগেই ‘ল্যাপস’ দেখানো হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়— একটি প্রিমিয়াম সময় মতো জমা হয়নি। অথচ তিনি দাবি করেন, সেই টাকা এজেন্টের হাতেই নগদে দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির নথিতে সেই অর্থ জমার কোনও রেকর্ড নেই।

কোম্পানির হেড অফিসে একাধিকবার ঘোরাঘুরি করেও তিনি শুধু একটি উত্তরই পান—“এজেন্টের হাতে টাকা দিলে তার দায় কোম্পানি নেবে না।”

বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নূর মোহাম্মদ ভূইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠানটিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আগের অনেক কিছুই ঠিক ছিল না। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানিটির সব শাখা কার্যত বন্ধ রয়েছে। গ্রাহকরা যাতে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হোন সেজন্য তিনি  প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছেন।

কাঠগড়ায় কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মীরা

কিস্তির টাকা কোম্পানিতে জমা না হওয়া, টাকা ওঠানোর সময় এসে কাগজপত্রের ঘাটতি দেখানো ও নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টির ঘটনা অহরহ ঘটছে । অনেক সময় জোনাল বা শাখা অফিসের কর্মকর্তার চাকরি চলে যাচ্ছে, কখনও কর্মকর্তারা বিমা কোম্পানি পরিবর্তন করে আরেক কোম্পানিতে চলে যাচ্ছে। এই সময়গুলোতে গ্রাহকের এক কিস্তি বা দুই কিস্তি জমা হচ্ছে না। বেশিরভাগ বিমা কোম্পানির হেড অফিস এটাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। আর পুরো দোষ দিয়ে পড়ছে মাঠকর্মীদের ওপর।

প্রশ্ন উঠছে, কোম্পানির নাম ব্যবহার করে বছরের পর বছর মাঠকর্মীরা টাকা তুললেও তা যাচাই করার কোনও কার্যকর ব্যবস্থা কেন নেই? আর ভুক্তভোগী গ্রাহকরা শেষ পর্যন্ত কার কাছে ন্যায়বিচার চাইবেন?

আবার কোম্পানিগুলোর লুটপাটের কারণে গ্রাহকের ভোগান্তির পাশাপাশি বিপদে পড়তে হচ্ছে মাঠকর্মীদের। মেয়াদোত্তীর্ণ বিমা পলিসির টাকা না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমা কোম্পানিগুলোর মাঠকর্মীরা বিপাকে পড়ছেন। মাঠকর্মীদের গ্রাহকের হাতে মার খাওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে অপমান সহ্য করতে হচ্ছে। হুমকি ও হামলার ঘটনাও ঘটছে। অনেকে বাসায় নিরাপদে থাকতে পারছেন না।

সিরাজগঞ্জে প্রাইম ইসলামী লাইফের মাঠকর্মীদের মারধর করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালে সদর উপজেলার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল আমিন সরকার আইডিআরএ’কে লিখিত আবেদন করেছেন। তিনি জানান, বিমার টাকা না দেওয়ায় গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন তিনি।

শুধু প্রাইম ইসলামী লাইফ নয়— পদ্মা লাইফ, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পপুলার লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, বায়রা লাইফ ও হোমল্যান্ড লাইফসহ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই একই অভিযোগ উঠছে।

বায়রা লাইফের মাঠকর্মী রুহুল আমিন  ১৫ বছর ধরে কোম্পানিতে কাজ করছেন।  তিনি জানান, গ্রাহকদের কাছে মুখ দেখানো কঠিন হয়ে পড়েছে। “মানুষের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। টাকা দিতে না পারায় প্রতিদিনই হুমকি-ধামকি পাচ্ছি,” বলেন তিনি। আরেক বিমা কোম্পানির মাঠকর্মী আখলাক হোসেন বলেন, “গ্রাহকের টাকার জন্য আমরা নিজেরাই কোম্পানির অফিসে ধর্না দিয়েছি, তবুও সমাধান নেই।”

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তা লিয়াকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে অভিযোগ করেন, কোম্পানির মালিকপক্ষ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা নিজেদের স্বার্থে অর্থ লুট করে নিলেও এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজে যে পলিসিগুলো করিয়েছেন, সেগুলোর অন্তত সাতশ’ গ্রাহকের দাবি পরিশোধ এখনও আটকে আছে। ২০১২ সাল থেকে দেখছি— লুটপাট করছেন কোম্পানির মালিক ও  এমডিরা, কিন্তু তার দায়  এসে পড়ছে মাঠকর্মীদের ওপর।

তিনি জানান, পাবনা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শাখা ও জোনাল অফিস বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানি। ফলে গ্রাহকরা দাবি আদায়ের জন্য সরাসরি মাঠকর্মীদের ধরছেন। তিনি বলেন, “বড় কর্মকর্তারা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান, কিন্তু আমরা তো বাড়িঘর ছেড়ে যেতে পারি না। গ্রাহকদের পাওনা আদায়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের দিয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করাতে হচ্ছে। মামলা হলেই কেবল কোনও কোনও  ক্ষেত্রে টাকা পাওয়া যায়,” বলেন তিনি।

লিয়াকত হোসেন আরও অভিযোগ করেন, কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করলেও শাখা অফিস ম্যানেজারের  ওপর বেশি বেশি পলিসি বিক্রির চাপ অব্যাহত রাখে। তার ভাষায়, “অফিস থেকে টার্গেট দেওয়া হয়। সেই টার্গেট পূরণ করতে না পারলে শাখা অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবে আশপাশের এলাকায় কয়েকশ’ অফিস বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানি।” এর ফলে গ্রাহকদের যন্ত্রণায় মাঠকর্মীরা কেউ ঠিকমতো বাড়িতে থাকতে পারছেন না।

আস্থা হারাচ্ছে পুরো খাত

লাইফ বিমা খাতে ক্রমবর্ধমান অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও অযৌক্তিক ব্যয়ের ফলে মারাত্মক তহবিল সংকট তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। পলিসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বহু ক্ষেত্রে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও তারা প্রাপ্য দাবি বুঝে পাচ্ছেন না।

গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রিমিয়াম আদায়ের সময় লাইফ বিমা কোম্পানিগুলো অত্যন্ত সক্রিয় থাকলেও দাবি পরিশোধের বেলায় তারা চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। ফলে বিমার ওপর মানুষের আস্থা দিন দিন ক্ষয় হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছেও এ সংক্রান্ত অভিযোগের চাপ বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্যে দেখা যায়, গত দুই বছরে লাইফ বিমা খাত নিয়ে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা দেড়গুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার প্রভাব পড়েছে খাতটির গ্রাহকভিত্তিতেও। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে লাইফ বিমা খাত থেকে ঝরে গেছে ১০ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি পলিসি। এই সময়ে পলিসি সংখ্যায় পতনের হার ১৩ শতাংশের বেশি, যা খাতটির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার স্পষ্ট প্রতিফলন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ও বিমা বিশেষজ্ঞ ড. মো. মাইন উদ্দিন মনে করেন, জীবন বিমা খাতে কমিশননির্ভর এজেন্ট মডেলই বর্তমানে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, “জীবন বিমা খাতে এজেন্টদের প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের ওপর অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু আছে, সেটিই মূলত গ্রাহক প্রতারণার সবচেয়ে বড় উৎস। এই মডেলে এজেন্টের আগ্রহ থাকে শুধু পলিসি বিক্রি পর্যন্ত। বিক্রির পর পলিসিটি টিকে থাকল কি না, প্রিমিয়াম নিয়মিত জমা পড়ছে কিনা, কিংবা ভবিষ্যতে দাবি পরিশোধ হবে কিনা— এসব বিষয়ে মাঠকর্মীদের বাস্তব কোনো দায়বদ্ধতা তৈরি হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “কমিশননির্ভর কাঠামোর কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এজেন্টরা বাস্তব ঝুঁকি গোপন করে অবাস্তব লাভের আশ্বাস দেন। কিন্তু পলিসি ডকুমেন্টে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না। ফলে কয়েক বছর পর যখন পলিসি ল্যাপস হয় বা দাবি আটকে যায়, তখন পুরো দায় গিয়ে পড়ে গ্রাহকের ওপর।”

মাঠপর্যায়ে অনিয়মের দায় শুধু কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, “এজেন্ট বা মাঠকর্মীর মাধ্যমে নগদ প্রিমিয়াম সংগ্রহের অনুমতি দিয়েই যদি কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর তদারকি না করে, তাহলে অনিয়ম হবেই। এখানে শুধু মাঠকর্মী নয়, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আইডিআরএ’র নজরদারি— দুটোই সমানভাবে দায়ী।”

ড. মাইন উদ্দিন মনে করেন, নন-লাইফ বীমায় ‘জিরো কমিশন’ নীতি চালুর মতো জীবন বিমা খাতেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।

“জীবন বিমাতেও ধাপে ধাপে কমিশন কমিয়ে স্থায়ী বেতনভুক্ত ও জবাবদিহিমূলক কর্মী কাঠামোয় যেতে হবে। না হলে কমিশনের লোভে পলিসি বিক্রি চলতেই থাকবে, আর গ্রাহক ঠকতেই থাকবে।”

সাধারণ বিমায় জিরো কমিশন নীতি: শৃঙ্খলা ফেরানোর বড় পদক্ষেপ

দেশের নন-লাইফ বা সাধারণ বিমা খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনতে নতুন বছরের শুরুতেই এক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সাধারণ বিমা খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘জিরো কমিশন’ নীতি। একইসঙ্গে এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে নন-লাইফ বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যক্তি এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।

আইডিআরএ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বিমা খাতে অবৈধ কমিশন, ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো, অতিরিক্ত ব্যয় ও তথ্য গোপনের মতো অনিয়ম চলছিল। এসব অনিয়ম বন্ধ করে বিমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত শক্তিশালী করা এবং গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কমিশন প্রথায় লাগাম

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে সাধারণ বিমা ব্যবসার বড় একটি অংশ— কখনও কখনও ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অবৈধ কমিশনে ব্যয় হতো। এতে একদিকে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছিল, অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল গ্রাহক ও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সাধারণ সম্পাদক ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিক শামীম বলেন, “কমিশন প্রথা বন্ধ হওয়ায় এখন বিমা কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয় বাড়বে। এর সুফল সরাসরি পাবেন গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা। সাধারণ বিমা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় মাইলফলক।”

বর্তমানে দেশে মোট ৪৬টি নন-লাইফ বিমা কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে ৪৩টি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত।

নজরদারিতে বিশেষ টিম

জিরো কমিশন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ নজরদারি দল গঠন করেছে। এই দল নিয়মিতভাবে বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। কোনও ধরনের অনিয়ম বা নীতিভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইডিআরএ’র মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

ব্যক্তি এজেন্ট কার্যক্রম স্থগিত

এদিকে নন-লাইফ বিমা খাতে গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ব্যক্তি এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিআরএ। কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নন-লাইফ বিমা ব্যবসায় কোনো ব্যক্তি এজেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। একই সঙ্গে কমিশন বা কমিশনের নামে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

আইডিআরএ’র প্রশাসন–২ শাখা থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিমা খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাতটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি