গ্রাহক ঠকানোর মহোৎসব (পর্ব ৪)

টাকা আটকে রাখা হয় শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে

গোলাম মওলা
১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৪০

দেশের জীবন বিমা খাতে গ্রাহকের দাবি (পাওনা টাকা) পরিশোধ না করাটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিসির মেয়াদ শেষ, কাগজপত্র ঠিক, দাবির অঙ্ক নির্ধারিত—সবকিছু ঠিক থাকার পরও হাজারো গ্রাহক বছরের পর বছর ঘুরছেন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। বাইরে থেকে এটি প্রশাসনিক জটিলতা মনে হলেও ভেতরের চিত্র আরও ভয়াবহ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে— গ্রাহকের টাকা আটকে রাখা কোনও দুর্ঘটনাজনিত ব্যর্থতা নয়। এটি শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। মালিকের আর্থিক চাহিদা মেটাতে এবং কোম্পানির ভেতর থেকে টাকা সরাতে, সচেতনভাবেই ‘ফ্রিজ’ করে রাখা হয় গ্রাহকের ন্যায্য দাবি। এই নীরব নীতির বোঝা বইছেন সাধারণ মানুষ— যাদের সঞ্চয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার হাতে বন্দি। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ প্রকাশিত হচ্ছে চতুর্থ পর্ব।

বাংলাদেশে জীবন  বিমা খাতে গ্রাহকের দাবির টাকা ফেরত পাওয়ার পথে এক বিস্ময়কর কাহিনি লুকিয়ে আছে । অনেক বিমা কোম্পানির হেড অফিসে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রথমে শেখানো হয়— কীভাবে জীবন বিমার দাবিকে আটকে রাখা যায়।

কিন্তু এই ‘কৌশল’ মাঠের কর্মী বা এজেন্টদের সঙ্গে শেয়ার করা হয় না। এমনকি  জোনাল  অফিসের কর্মকর্তা বা রিজিওনাল অফিসের মাঠদলও এর খবর পায় না। এর ফলে ঘটে এমন ঘটনা, যা গ্রাহক ও মাঠকর্মীদের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

একটি বিমা কোম্পানির মধ্যম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, “আমরা চাইলে বিমার দাবির টাকা দ্রুত দিতে পারি। কিন্তু অফিসের ‘নিয়ম’ প্রত্যেক গ্রাহকের দাবির টাকা কিছুদিন আটকে রাখা।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই কৌশল মূলত হেড অফিসের নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। কর্মকর্তারা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ফাইল প্রক্রিয়াধীন রাখার সুযোগ নেন। তবে এই পদ্ধতি কখনও অফিসিয়াল নীতিমালায় প্রকাশ করা হয় না। ফলে মাঠকর্মীদের কাছে এটি এক অজানা ঝুঁকি।’’

অর্থাৎ একাধিক জীবন বিমা কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রাহকের দাবি পরিশোধ ইচ্ছাকৃত বিলম্বিত রাখাই অনেক প্রতিষ্ঠানের অলিখিত নীতি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মেয়াদ পূর্ণ হওয়া মানেই দাবি পরিশোধ নয়। বরং হেড অফিসের মৌখিক নির্দেশনা থাকে— দাবির ফাইল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ‘নড়াচড়া না করার’। এই সময়সীমা কোথাও ছয় মাস, কোথাও এক বছর, আবার কোথাও দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত গড়ায়।

ফাইল না দেখাই প্রথম ধাপ

একটি শীর্ষস্থানীয় জীবন বিমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এমডির নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়াদপূর্তির অন্তত ছয় থেকে সাত মাস পরে প্রথমবার ফাইল দেখা হয়। তার আগে ফাইল গ্রহণ না করাই নিয়ম। ‘যতক্ষণ পর্যন্ত ফাইলে কোনও ত্রুটি বা অসঙ্গতি ধরা না পড়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফাইল গ্রহণ করার দরকার নেই—এমন নির্দেশনা থাকে। ত্রুটি খুঁজতে খুঁজতেই দুই-তিন বছর লেগে যায়।’ এই নির্দেশনা কোনও লিখিত নীতিমালায় নেই, কিন্তু বাস্তবে এটি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।

শুধু তাই নয়, বেশ কিছু কোম্পানি ফাইলে কোনও ত্রুটি বা অসঙ্গতি ধরা না পড়লেও গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করে না। ফাইলে কোনও ত্রুটি বা অসঙ্গতি না থাকলেও বছরের পর বছর গ্রাহকের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের রাজশাহী অঞ্চলের একটি শাখার ইনচার্জ লিয়াকত আলী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্তত এক হাজার গ্রাহকের পলিসি করিয়েছি। ডকুমেন্টে কোনও সমস্যা নেই, কিস্তি পরিশোধে কোনও অনিয়ম নেই, কাগজপত্রও শতভাগ ঠিক। তবু বছরের পর বছর ধরে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। বর্তমানে আমার প্রায় ৭০০ জন গ্রাহকের দাবি ফাইল ঝুলে আছে।”

লিয়াকত আলীর অভিযোগ, এখন কোম্পানির অলিখিত নীতিই হয়ে দাঁড়িয়েছে—মামলা না করলে দাবি পরিশোধ করা হবে না। তিনি বলেন, “প্রতিদিন গ্রাহকরা আমাকে ঘিরে ধরছেন তাদের পাওনার জন্য। এই চাপ থেকে বাঁচতে হেড অফিসের এক পরিচিত কর্মকর্তার পরামর্শে একজন গ্রাহককে বাদী করে মামলা দায়ের করতে হচ্ছে, তারপর সেই মামলার মাধ্যমেই টাকা তোলা হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, রাজশাহী অঞ্চলের সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের সব অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়ে দিনের পর দিন হেড অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। ঢাকা অফিসে ঘুরতে ঘুরতেই জুতা ক্ষয়ে যাচ্ছে।

লিয়াকত আলীর দাবি, ‘‘যেসব গ্রাহকের পলিসি ‘ম্যাচিউরড’ হয়েছে, তিন থেকে চার বছর পার হয়ে গেলেও এখনও টাকা দেওয়া হয়নি। আমি এসব গ্রাহকের তালিকা করে আবেদন করেছি। কিন্তু তাতেও কোনও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মামলা করতে হয়েছে।”

তিনি জানান, একটি তালিকায় ৩০ লাখ টাকার দাবির জন্য মামলা করা হয়েছে, আরেকটি মামলায় দাবি করা হয়েছে ৪২ লাখ টাকা এবং অন্য একটি মামলায় ৩৫ লাখ টাকা। এর আগেও মামলা করে তবেই গ্রাহকদের দাবি আদায় সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

লিয়াকত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি যখন চাকরিতে যোগ দিই, তখন তো বলা হয়নি—মামলা করলেই শুধু দাবি পরিশোধ হবে। এখন উল্টো হেড অফিস থেকেই মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মামলা করাও সহজ নয়—এতে বাড়তি খরচ, সময় ও সীমাহীন ভোগান্তি রয়েছে।”

শেষ পর্যন্ত হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, “এভাবে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করা এক ধরনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

মালিকের চাপে ফ্রিজ হয় গ্রাহকের টাকা

বিমা বিশেষজ্ঞ যমুনা ও হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক সিইও ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘‘জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর মালিকদের আর্থিক চাহিদা অত্যন্ত বেশি। মালিকদের একটি অংশ কোম্পানি থেকে যখন-তখন টাকা নেওয়ার ধান্দা করেন। হঠাৎ করে কোনও মালিক যদি এমডির কাছে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন, তখন এমডির সামনে কার্যত কোনও বিকল্প থাকে না।’’

তার ভাষায়, “এমডিদের মূল কাজই হয়ে দাঁড়ায় মালিকদের পারপাস সার্ভ করা। মালিক যা চান, এমডিকে সেটাই বাস্তবায়ন করতে হয়। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকের দাবি পরিশোধের চেয়ে মালিককে খুশি রাখাই অগ্রাধিকার পায়। এই চাপ সামাল দিতেই গ্রাহকের দাবি পরিশোধের টাকা ‘ফ্রিজ’ করে রাখা হয়।’’

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ধরুন, পলিসি ম্যাচিউরড হওয়ার পর এক লাখ টাকা করে পাওনা রয়েছে— এমন এক হাজার গ্রাহকের দাবি যদি আটকে রাখা হয়, তাহলে কোম্পানির হাতে থেকেই যায় ১০ কোটি টাকা।”

এই টাকাই ধাপে ধাপে মালিকরা বিভিন্ন খাতে তুলে নেন। আর সেই ঘাটতি ঢাকতে গিয়ে গ্রাহকের ফাইলের মধ্যে সামান্য অসঙ্গতি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের পক্ষে আইডিআরএ’র থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আইডিআরএ মালিকদের পক্ষ নেন।

হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘‘কোম্পানির ম্যাচিউরড হওয়া পলিসির গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ না করার জন্য তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ থেকে নিয়মিত চাপ দেওয়া হতো। মালিকপক্ষের প্রত্যাশা ছিল— এই অর্থ আটকে রেখে পরে তা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। সে কারণেই গ্রাহকের বৈধ দাবি পরিশোধে পরিকল্পিতভাবে বাধা সৃষ্টি করা হতো।’’

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডলের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন এমডি হিসেবে তার মূল দায়িত্ব ছিল গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করা। বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী, যেসব গ্রাহকের পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে, তাদের পাওনা পরিশোধ করাই ছিল তার নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব। সে দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি ‘ম্যাচিউরড’ হওয়া গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করেন। এই কারণেই মালিকপক্ষ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক হয়ে ওঠে— যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ থেকেও তিনি কোনও সমর্থন পাননি। তার অভিযোগ, গ্রাহকের স্বার্থে অবস্থান নেওয়ার বদলে আইডিআরএ ওই সময় মালিকপক্ষের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।

লাইফ ফান্ড সংকুচিত রেখে বিনিয়োগ

গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য যে লাইফ ফান্ড গঠন করার কথা, বাস্তবে সেই ফান্ডই এখন সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। বরং গ্রাহকের টাকা ‘ফ্রিজ’ করে রেখে তা বিনিয়োগে সরিয়ে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত চিত্র উঠে এসেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে জীবন বিমা খাতের ৩৬টি কোম্পানি লাইফ ফান্ডে নতুন করে জমা করেছে মাত্র প্রায় ১০০ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে এই কোম্পানিগুলো নতুন করে বিনিয়োগ করেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে যেখানে টাকা রাখার কথা, সেখানে সেই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ব্যবসায়িক বিনিয়োগে।

আরও উদ্বেগজনক হলো—এই ৯ মাসে ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ২০টি কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, অথচ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের একমাত্র ভরসা লাইফ ফান্ড ছোট করেছে অন্তত ১৭টি কোম্পানি। প্রশ্ন উঠছে, লাইফ ফান্ড সংকুচিত করে বিনিয়োগ বাড়ানো কি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরব সম্মতিতেই হচ্ছে?

আইডিআরএ’র প্রতিবেদনে উঠে আসা সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির লাইফ ফান্ড ছিল ৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে সেই ফান্ড কমে শূন্যে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে কোম্পানিটির বিনিয়োগ কমেনি— বরং বেড়েছে। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বায়রা লাইফের বিনিয়োগ ছিল ৫৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়।

সবচেয়ে গুরুতর তথ্য হলো, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সে পলিসি ম্যাচিউর হওয়া গ্রাহকদের মোট পাওনা প্রায় ৮০ কোটি টাকা। অথচ এই পুরো সময়ে কোম্পানিটি দাবি নিষ্পত্তি করেছে মাত্র ৪০ লাখ টাকার। অর্থাৎ শত শত গ্রাহকের টাকা আটকে রেখে কোম্পানিটি বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং সেই অনিয়ম ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল কার্যত নির্বিকার।

একই কৌশল অনুসরণ করছে সান লাইফ, সানফ্লাওয়ার, শান্তা, প্রটেকটিভ, প্রাইমসহ অন্তত এক ডজন জীবন বিমা কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য গঠিত লাইফ ফান্ড ছোট করা হয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগ বেড়েছে। ফলে বছরের পর বছর গ্রাহকের টাকা আটকে থাকছে এবং গ্রাহককে বাধ্য করা হচ্ছে মামলা, তদবির কিংবা দালালের আশ্রয় নিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত আর্থিক কৌশল। লাইফ ফান্ড সংকুচিত করে বিনিয়োগ বাড়ানো মানে গ্রাহকের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া— যা বিমা আইন ও ন্যূনতম নৈতিকতারও পরিপন্থি। এরপরও প্রশ্ন থেকেই যায়— লাইফ ফান্ড শূন্য বা সংকুচিত হওয়ার পরও এসব কোম্পানি কীভাবে নতুন বিনিয়োগের অনুমোদন পাচ্ছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, গ্রাহকের টাকা আটকে রেখে বিনিয়োগ বাড়ানোর এই খেলায় আইডিআরএ আসলে নিয়ন্ত্রক, নাকি নীরব দর্শক?

মাঠপর্যায়ের কর্মীরাও জানেন না গোপন নীতি

এই দাবি আটকে রাখার কৌশল কখনও মাঠপর্যায়ের কর্মী বা এজেন্টদের জানানো হয় না। ফলে তারা গ্রাহকের কাছে গিয়ে বিব্রত হন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে ফিল্ড অফিসের ওপর। কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মধ্যম পর্যায়ের একজন বিমা কর্মকর্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘‘অফিসের অলিখিত নিয়ম হলো— সব গ্রাহকের দাবির টাকা কিছুদিন আটকে রাখা।”

নিয়ন্ত্রক দুর্বল, শাস্তি নেই

আইডিআরএ-তে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর শাস্তির নজির নেই। ফলে শীর্ষ নেতৃত্ব জানে, দাবি আটকে রাখলেও বড় কোনও পরিণতি হবে না। এই শাস্তিহীনতাই ‘ফ্রিজ নীতি’কে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের লুকানো কৌশল ও গ্রাহকের দাবির দীর্ঘসূত্রতা আস্থা কমায়।  মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত বিমার নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স প্রফেশনালস সোসাইটির (বিআইপিএস) জেনারেল সেক্রেটারি এ কে এম এহসানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জীবন বিমায় দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে সচেতনভাবে নেওয়া একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত।’’ তার ভাষায়, ‘‘বিমা আইনে গ্রাহকের ম্যাচিউরড দাবি পরিশোধের জন্য লাইফ ফান্ড সংরক্ষণের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই অর্থ ফান্ডে না রেখে বিনিয়োগ বা এফডিআরে আটকে রাখা হচ্ছে। এটি নিছক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং পরিকল্পিত কৌশল।”

তিনি বলেন, ‘‘সময়কে এখানে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দাবি যত দীর্ঘ সময় আটকে থাকে, তত বেশি গ্রাহক মানসিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। অনেকেই আইনি লড়াইয়ের সক্ষমতা হারান, কেউ মামলা-মোকদ্দমার ঝামেলা এড়িয়ে হাল ছেড়ে দেন। আবার গ্রাহক মারা গেলে তার পরিবার আর সেই চাপ ধরে রাখতে পারে না। এর ফলে দাবি নিষ্পত্তি না করেই কোম্পানিগুলো গ্রাহকের টাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।’’

এ কে এম এহসানুল হক আরও বলেন, ‘‘লাইফ ফান্ড সংকুচিত করে বিনিয়োগ বাড়ানো যদি বছরের পর বছর চলতে পারে, তাহলে স্পষ্ট হয় যে, এটি দুর্ঘটনাজনিত নয়। এখানে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি কাজ করছে। দাবি পরিশোধে সময়ক্ষেপণকে কঠোরভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে না দেখলে এই ‘ফ্রিজ নীতি’ বন্ধ হবে না।”

গ্রাহক ঠকানো শুরু হয় নথি যাচাইয়ের নামে 

প্রতিবছর গ্রাহকের জমা দেওয়া টাকা কীভাবে আত্মসাৎ করবেন, তার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শুরু হয় নথি যাচাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণ। একদিকে কোম্পানি থেকে টাকা সরানোর কাজ চলে, অপরদিকে গ্রাহকের মূল নথি যাচাইয়ের জন্য হয়রানি পর্ব শুরু হয়।

বিমা কোম্পানিতে টাকা জমানো গ্রাহকদের প্রায় সবার একই বক্তব্য। এটি হলো– বাংলাদেশের বিমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দাবি পরিশোধে অনিয়ম ও বিলম্ব, যার ফলে গ্রাহকদের মধ্যে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। আর বিমা কোম্পানিতে চাকরি করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, অনেক কোম্পানি ইচ্ছে করে সময়মতো বা পূর্ণাঙ্গভাবে  দাবি পরিশোধ করে না।  আবার কোথাও লাইফ ফান্ড লুটপাটের কারণে টাকা থাকলেও পরিশোধের সক্ষমতা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিহীনতা।

মেয়াদ উত্তীর্ণের পরও টাকা না পাওয়া অন্তত এক ডজন ভুক্তভোগী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন তাদের অভিযোগের কথা। তারা বলেছেন, মেয়াদপূর্ণ করার পর দাবি পাওয়ার কথা শুনে কোম্পানির ফিল্ড অফিসে যাওয়ার পর নানা অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কখনও বলা হয়— ‘ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’, কখনও—‘মূল নথি যাচাইয়ে সময় লাগবে’, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে—‘ঢাকায় পাঠানো হয়েছে’।

এক ভুক্তভোগী জানান “আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মাসের মাথায় দাবি জমা দিই। দুই বছর পার হয়ে গেছে, এখনো টাকা পাইনি। বলছে—হেড অফিসে আছে। হেড অফিসে গেলে বলে— শাখা অফিসে পাঠানো হয়েছে।”

এই অবহেলায় অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ধ্বংস হচ্ছে— যে অর্থ দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা বা সংসার চালানোর কথা ছিল, সেই অর্থ বেঁধে রাখা হয় ‘অভ্যন্তরীণ যাচাই’ নামের এক অনির্দিষ্ট অজুহাতে।

পাবনার আটঘরিয়ার প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্সের গ্রাহক মো. ইউসুফ আলী মিয়া জানান, গত সাড়ে চার বছর আগে তার পলিসি ম্যাচিউর হলেও তিনি দাবির টাকা পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র কাছে প্রতিকার চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার পাওনা টাকা তিনি পাননি।

সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্সের পিরোজপুরের গ্রাহক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘নিয়ম মেনে কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছি। মেয়াদ শেষ হওয়ার সাড়ে চার বছর পরও যখন টাকা পাইনি।  তখন বাধ্য হয়ে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্সের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি। মামলা মোকদ্দমা করেও এখনও পর্যন্ত দাবির টাকা পাইনি।’’

ইচ্ছে করেই ফাইল আটকে রাখা হয়

মতিঝিলের একটি শীর্ষস্থানীয় জীবন বিমা কোম্পানির হেড অফিসে অনুসন্ধানে দাবি পরিশোধে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার চিত্র পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদককে কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ফাইল তৎক্ষণাৎ গ্রহণ বা প্রক্রিয়াকরণ করা হয় না। কোম্পানির এমডির নির্দেশনা অনুযায়ী, মেয়াদ পূর্তির প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেই ফাইল দেখা হয়।

ওই কর্মকর্তার ভাষায়, “কোনও ত্রুটি বা অসঙ্গতি আছে কিনা তা আগে যাচাই করতে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ফাইলে কোনও ত্রুটি ধরা পড়ে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ফাইল গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। এভাবে প্রায় দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।”

তিনি জানান, ফাইল কোম্পানির সুবিধামত সময়ে প্রক্রিয়া করা হয়। এখানে বিমা আইনের কোনও তোয়াক্কা করা হয় না। এই প্রক্রিয়ার ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় ধরে দাবির টাকা পাচ্ছেন না এবং নীরব দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছেন।

পলিসি বাতিল ও তামাদি

নির্ধারিত সময়ের আগেই জীবন বিমা পলিসি বাতিল হলে গ্রাহক পুরো টাকা ফেরত পান না। বড় একটি অংশ থেকে যায় বিমা কোম্পানির কাছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— পলিসি টিকিয়ে রাখার দায় কি কোম্পানিগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে?

আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১৭ লাখ ৭১ হাজার নতুন জীবন বিমা পলিসি চালু হলেও একই বছরে বাতিল হয়েছে ১১ লাখ ৫০ হাজার। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানিতে তামাদি হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি পলিসি। তালিকায় শীর্ষে সোনালী লাইফ (৬৪ হাজার), এরপর ন্যাশনাল লাইফ (৪৬ হাজার) ও প্রাইম ইসলামী লাইফ (১৯ হাজার)।

২০০৯ সালে সক্রিয় পলিসি ছিল ১ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেমে এসেছে ৬৮ লাখে। এ সময়ে বাতিল বা তামাদি হয়েছে ২৬ লাখের বেশি পলিসি।

বাজার বড়, আস্থা কম

তবে সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের বিমা খাত ছোট নয়। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের মোট বিমা বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবন বিমা খাতের দখল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা, আর নন-লাইফ বিমার বাজার প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা

বাজারের নেতৃত্ব এখনও বিদেশি প্রতিষ্ঠান মেটলাইফের হাতে। দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ, ডেলটা লাইফ ও পপুলার লাইফ তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও আস্থা সংকট আছে।

বিমা খাতে আস্থা নেই মানুষের: গবেষণা

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের ২০২৪ সালের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বিমা খাত বিস্তৃত না হওয়ার মূল কারণ হলো— সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া এবং প্রতারণার অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ স্বীকার করেছেন, জীবন ও সাধারণ— উভয় ধরনের বিমা কোম্পানির একটি অংশে অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। তার ভাষায়, “লাইফ ও নন-লাইফের বেশ কিছু কোম্পানিতে অর্থ লোপাট হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো মারাত্মক অর্থসংকটে পড়েছে এবং গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করতে পারছে না।”

তিনি বলেন, ‘‘কিছু অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো বিমা খাতের প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি কোম্পানির কারণে সবাই বিমা খাতকে ঘৃণা করছে,’’ মন্তব্য করেন তিনি।

পরিস্থিতি বদলাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান বিআইএ সভাপতি। তিনি বলেন, “আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। যারা গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী