নির্বাচন সামনে রেখে নগদ টাকার ছড়াছড়ি

গোলাম মওলা
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতির পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থায়ও তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক তৎপরতা। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ টাকার প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে। নির্বাচনি প্রচার, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের নানা খরচ মেটাতে প্রার্থীদের বড় একটি অংশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের পথে হাঁটছেন— যার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে— ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। নভেম্বরে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, সেখানে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসেই নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক সময়ে নগদ টাকা উত্তোলনের পরিমাণ বেড়েছে। প্রার্থীরা প্রচার ব্যয় মেটাতে নগদ অর্থ ব্যবহার করছেন বলেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”

তিনি জানান, বড় বা সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে এবং ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত এসব লেনদেন রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।

হঠাৎ উল্টো স্রোত

নগদ টাকার এই ঊর্ধ্বগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ— কারণ, এর আগের কয়েক মাসে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়জুড়ে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমছিল। জুলাইয়ে যেখানে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে এই পতন অব্যাহত থেকে নভেম্বরে নেমে আসে ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হঠাৎ উল্টো স্রোত নির্বাচনের সঙ্গেই সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশই নগদে হয়। তাই ভোটের আগে মানুষের হাতে নগদ টাকা বাড়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেন হলে তা বিএফআইইউকে রিপোর্ট করার ব্যবস্থাও কার্যকর রয়েছে।”

কালোটাকার আশঙ্কা

নগদ টাকার এই দ্রুত বিস্তার নতুন করে কালোটাকার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেই আশঙ্কা থেকেই নির্বাচনের আগে নজরদারি জোরদার করেছে বিএফআইইউ।

গত ১১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে— কোনও হিসাবে এক দিনে এক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলন হলে তা বাধ্যতামূলকভাবে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) আকারে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। অনলাইন, এটিএমসহ সব ধরনের নগদ লেনদেনই এর আওতায় পড়বে।

পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হলে, কিংবা ভুল তথ্য দিলে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

নির্বাচনের আগে রেমিট্যান্সে জোয়ার

নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি নির্বাচনকে সামনে রেখে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকে দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক চিত্র— তাহলো রেমিট্যান্স।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— এই দুই মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এর আগের মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স ছিল রেকর্ড ছোঁয়া— ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত রমজান বা ঈদকেন্দ্রিক সময়ে রেমিট্যান্স বাড়ে। কিন্তু এবার মৌসুমি কারণের বাইরে গিয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসীদের একটি অংশ অতিরিক্ত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, এমন ইঙ্গিত মিলছে।

ডলার কিনে বাজারে টাকার জোগান

রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহও বেড়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিলামের মাধ্যমে ১৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে এই ডলার কেনা হয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এই লেনদেনের বিপরীতে মঙ্গলবারেই (৩ ফেব্রুয়ারি) বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯১ কোটি টাকা (২,০৯১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা), যা টাকার বাজারে তারল্য বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে এ পর্যন্ত মোট ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে আনুমানিক ৪ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা।

আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। গড় বিনিময় হার অনুযায়ী, এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক ভালো রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জোরদার করছে, অপরদিকে টাকার বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অতিরিক্ত তারল্য মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও তৈরি করতে পারে। ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট

নির্বাচনের আগে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আসছে ডিজিটাল লেনদেনে। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ সব মোবাইল ব্যাংকিংসেবায় একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন। প্রতিটি লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা।

একইসঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে (পিটুপি)) অর্থ স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। লক্ষ্য একটাই ভোটার প্রভাবিত করতে অর্থের অপব্যবহার ঠেকানো।

অদৃশ্য অর্থের দাপট ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনি মাঠে পোস্টার-মিছিলের বাইরেও যে এক বিশাল অদৃশ্য অর্থনীতি কাজ করছে, নগদ টাকার এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দেয়। যদিও নির্বাচন কমিশন ভোটারপ্রতি ব্যয় সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, বাস্তবে সেই সীমা কাগজেই রয়ে গেছে বলে অভিযোগ বহু প্রার্থীর।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতাই কালোটাকার মূল উৎস। এখান থেকেই জন্ম নেয় দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার— যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

এই পরিস্থিতিতে কালোটাকার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন ভোটাররাই— এমনটাই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের আরও কঠোর ও কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিন বলেও তাদের মত। 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
এমপি মাসুদের দম্ভোক্তির জোর কোথায়?
দুই ঘণ্টায় ওসিকে চেয়ার থেকে সরিয়েছি, মেজরকে চেইঞ্জ করেছি, পাওয়ারে এমপি হইছি
আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন?
সর্বশেষ খবর
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী