১০ লাখ টাকার সীমা ঘিরে তোলপাড়

এনবিএফআই কেলেঙ্কারির দায় কেন আমানতকারীদের ওপর?

গোলাম মওলা
১৬ জুন ২০২৬, ২২:০০ আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ২২:০১

বহু বছর ধরে আটকে থাকা সঞ্চয়ের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন হাজারো আমানতকারী। চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, অবসরের নিরাপত্তা কিংবা জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) জমা রাখা অর্থ ফেরত না পেয়ে অনেকেই ইতোমধ্যে চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন। ঠিক এমন সময়ে সংকটে থাকা পাঁচটি এনবিএফআই বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এর সঙ্গে উঠে এসেছে নতুন এক বিতর্ক—প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে যে প্রস্তাবনা আলোচনায় এসেছে, তা নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে আমানতকারীদের মধ্যে।

অনেকের প্রশ্ন, একজন গ্রাহক যদি ২০ লাখ, ৩০ লাখ বা ৫০ লাখ টাকা বৈধভাবে কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখেন, তাহলে তিনি কেন তার পুরো অর্থ ফেরত পাবেন না? কেন তার কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে? অর্থনীতিবিদদের একাংশও বলছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা শুধু আমানতকারীদের জন্য অন্যায্য হবে না, বরং পুরো আর্থিক খাতের ওপর জনগণের আস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

‘আমরা তো সরকারের নিয়ম মেনেই টাকা রেখেছি’

ক্ষুব্ধ আমানতকারীদের বক্তব্য, তারা কোনও অবৈধ বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানেই টাকা জমা রেখেছিলেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, লুটপাট কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

একজন আমানতকারী বলেন, ‘সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে। এখন যদি বলা হয় ২০ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১০ লাখ টাকা ফেরত পাবো, তাহলে বাকি ১০ লাখ টাকার দায় কে নেবে?’’

আরেকজন ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, ‘‘যে ব্যক্তি ৫০ লাখ টাকা জমা রেখেছেন, তিনি কেন ৪০ লাখ টাকা হারাবেন? আমরা তো কোনও জুয়া খেলিনি বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করিনি। সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলেই রাষ্ট্র এসব প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে।’’

লুটপাটের দায় কার?

এনবিএফআই খাতের সংকট কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্টি হয়নি। বিভিন্ন তদন্ত, আদালতের নথি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের চিত্র।

বিশেষ করে পি কে হালদার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লোপাটের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দাবি করেছিলেন, পি কে হালদারের ক্ষমতার উৎস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী এবং নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এস কে সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদক তদন্তও চালিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমানতকারীদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির কারণে অর্থ লুটপাট হয়ে থাকে, তাহলে তার খেসারত কেন সাধারণ গ্রাহকদের দিতে হবে?

২৭ হাজার আমানতকারীর ভাগ্যে কী আছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।

এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৪ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের মধ্যে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব মূল্যায়ন করতে চায়। এরপর আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবনার মধ্যে একটি হলো ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধের বিষয়টি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তার ভাষায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। অর্থাৎ, এখনও নীতিনির্ধারকদের সামনে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া, ধাপে ধাপে পরিশোধ করা কিংবা নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের একাধিক বিকল্প খোলা রয়েছে।

গভর্নরের জন্য বড় পরীক্ষা

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক সংস্কার এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু এনবিএফআই আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রশ্নে নেওয়া সিদ্ধান্তই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় জনআস্থার পরীক্ষা।

যদি এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে আমানতকারীদের একটি বড় অংশ তাদের বৈধ আমানতের বড় অংশ হারান, তাহলে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটি খুবই সরল—রাষ্ট্রের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে রাখা টাকা ফেরত না পেলে সেই দায় কার?

আস্থা পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় শর্ত

অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনগণের আস্থা। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন। যদি আমানতকারীরা মনে করেন যে রাষ্ট্রীয় তদারকির আওতায় থাকা কোনও প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখেও পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তাহলে ভবিষ্যতে শুধু এনবিএফআই নয়, সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতিই মানুষের অনাস্থা তৈরি হতে পারে।

তাই অনেকের মত, অবসায়ন প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং লুটপাটের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার পথ খুঁজতে হবে।

কারণ এনবিএফআই খাতের সংকটের জন্য দায়ী নয় আমানতকারীরা, তারা বরং এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। আর সেই ভুক্তভোগীদের ওপর নতুন করে আর্থিক ক্ষতির বোঝা চাপানো হলে তা অনেকের কাছেই ন্যায়বিচারের বদলে আরেক ধরনের শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ নেই, মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে আমানতকারীর মুনাফা 
ঋণ চাইছে বাংলাদেশ, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কীভাবে?
‘অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে হিন্দুরা এখন বেশি সুখে-শান্তিতে আছেন’
সর্বশেষ খবর
দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ
দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী