বিতর্কের মুখে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো বিজিএমইএ

গোলাম মওলা 
১৭ জুন ২০২৬, ২০:৫৩ আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ২০:৫৩

দেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) অবশেষে তাদের বহুল আলোচিত ভোটাধিকার-সংক্রান্ত প্রস্তাব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগঠনটির আসন্ন নির্বাচনে যেসব সদস্যের বর্তমানে সরাসরি রফতানি নেই বা ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সেবা গ্রহণের রেকর্ড নেই, তাদের ভোটাধিকার বাতিলের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ব্যাপক বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত শিথিল করা হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন এমন সদস্যদের ভোটাধিকার বহাল থাকবে, যাদের কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে বর্তমানে রফতানি কার্যক্রম নেই। ফলে বন্ধ, রুগ্ন বা সাময়িকভাবে উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমের বাইরে থাকা শত শত পোশাক কারখানার মালিক বিজিএমইএর নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। 

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যত নিজেদের আগের অবস্থান থেকে সরে এলো বিজিএমইএ। 

কী ছিল বিতর্কিত প্রস্তাব 

গত ২৪ মে বিজিএমইএ একটি নোটিশ জারি করে জানায়, ২০ জুন অনুষ্ঠেয় বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) সংঘবিধির একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনা হবে। সেখানে বলা হয়েছিল, যে সদস্য বর্তমানে রফতানি কার্যক্রমে যুক্ত নন অথবা বিজিএমইএ থেকে এককভাবে ইউডি সেবা গ্রহণ করেন না, তিনি সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না এবং ভোটাধিকারও প্রয়োগ করতে পারবেন না। 

প্রস্তাবটি সামনে আসার পর থেকেই সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বন্ধ, রুগ্ন কিংবা আর্থিক সংকটে থাকা কারখানার মালিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, তারা সংগঠনের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ পড়ে যাবেন। 

অনেক উদ্যোক্তার মতে, ব্যাংক ঋণসংকট, বৈশ্বিক বাজারের চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার এবং আর্থিক দুরবস্থার কারণে বহু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বা রফতানি কার্যক্রম কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তাই বলে তাদের শিল্প মালিক হিসেবে পরিচয় কিংবা ভবিষ্যতে ব্যবসায় ফিরে আসার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। 

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের পর শুরু হয় আলোচনা

গত ১৩ জুন বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত বন্ধ ও রুগ্ন কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা শীর্ষক প্রতিবেদনে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখানো হয়, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে শুধু শত শত উদ্যোক্তা ভোটাধিকার হারাবেন না, বরং সরকারের শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করতে পারে।  

প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিজিএমইএর ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ব্যবসায়ী নেতারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে ও আড়ালে মতামত দিতে শুরু করেন। অনেকেই যুক্তি দেন, যারা সাময়িক সংকটে আছেন, তাদের সংগঠন থেকে দূরে ঠেলে দিলে শিল্প পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

এরপর রাজধানীর একটি হোটেলে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই মূলত সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।  

কেন অবস্থান বদলাতে হলো

বিজিএমইএ’র ভেতরে প্রভাবশালী দুই নির্বাচনি জোট— ‘ফোরাম’ এবং ‘সম্মিলিত পরিষদ’— উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করে যে, শুধু রফতানির বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে ভোটাধিকার নির্ধারণ করলে তা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করবে। 

একদিকে রয়েছে এমন বহু কারখানা, যেগুলো বর্তমানে সরাসরি রফতানি করছে না, কিন্তু সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং জটিলতা বা আর্থিক সংকটের কারণে সাময়িকভাবে রফতানি বন্ধ রেখেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিলে সংগঠনের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। 

এছাড়া সরকারের শিল্প পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির বাস্তবতাও বিবেচনায় আসে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণার পর একই সময়ে বিজিএমইএ যদি বন্ধ কারখানার মালিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, তাহলে সেটি সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বার্তা দিত। 

কী সিদ্ধান্ত হলো

সর্বশেষ সমঝোতা অনুযায়ী, যেসব সদস্যের বর্তমানে রফতানি নেই বা ইউডি নেই, কিন্তু কারখানা, অবকাঠামো এবং মেশিনারিজ রয়েছে, তারা ভোটাধিকার বহাল রাখবেন। 

তবে যেসব সদস্যের কোনও কারখানা নেই, উৎপাদন সক্ষমতা নেই এবং কার্যত শুধু কাগজে-কলমে সদস্যপদ রয়েছে, তাদের ভোটাধিকার না রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিষয়টি এখন ২০ জুনের ইজিএমে উত্থাপন করা হবে। সেখানে ভোটাভুটির মাধ্যমে সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। 

কী বলছেন নেতারা 

বিজিএমইএর নেতারা বলছেন, যাদের কারখানা ও মেশিনারিজ রয়েছে, তাদের ভোটাধিকার বজায় রাখার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। 

নির্বাচনি সমীকরণেও প্রভাব 

বিজিএমইএ’র নির্বাচন শুধু একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন নয়; এটি দেশের ব্যবসায়ী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন সম্মিলিত পরিষদ সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকলেও বর্তমানে ফোরাম প্যানেল নেতৃত্বে রয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতো এবং নির্বাচনি ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারতো। অনেক উদ্যোক্তা ভোটাধিকার হারালে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারতো বলে আশঙ্কা ছিল। 

সেই বাস্তবতাও বিজিএমইএর অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথেই বিজিএমইএ

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভোটাধিকার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথেই হাঁটতে হচ্ছে বিজিএমইএকে। সদস্যদের প্রতিক্রিয়া, শিল্প পুনরুজ্জীবনের জাতীয় লক্ষ্য, নির্বাচনি ভারসাম্য এবং সংগঠনের ঐক্য— সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পথ বেছে নিয়েছে সংগঠনটি। 

এখন নজর ২০ জুনের ইজিএমের দিকে। সেখানে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিললে বিজিএমইএর নির্বাচনে রফতানিবিহীন কিন্তু সক্ষম কারখানাগুলোর মালিকদের ভোটাধিকার বহাল থাকবে এবং সাম্প্রতিক এই বিতর্কেরও আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটবে। 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
রফতানি ৬ শতাংশ বাড়লেও পিছিয়ে পড়ছে বেশি মূল্যের পোশাক
টেকসই পোশাকশিল্প গড়তে বিজিএমইএর ইএসজি প্ল্যাটফর্ম চালু
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন: রাষ্ট্রপতি
সর্বশেষ খবর
নাচের ভিডিওতে ভাইরাল পরীমণি, সঙ্গে কিবরিয়া
নাচের ভিডিওতে ভাইরাল পরীমণি, সঙ্গে কিবরিয়া
‘ক্রসফায়ারে’ বিএনপি নেতাকে হত্যায় সাবেক ওসি ও এসআই গ্রেফতার
‘ক্রসফায়ারে’ বিএনপি নেতাকে হত্যায় সাবেক ওসি ও এসআই গ্রেফতার
বদলির আগে একদিনে এক ‘সন্ত্রাসীর’ ৬৫ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার হাবীব
বদলির আগে একদিনে এক ‘সন্ত্রাসীর’ ৬৫ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার হাবীব
ইয়েমেনে সৌদির বিমান হামলায় ১৪ নিহত, দাবি হুতিদের
ইয়েমেনে সৌদির বিমান হামলায় ১৪ নিহত, দাবি হুতিদের
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু