রফতানি ৬ শতাংশ বাড়লেও পিছিয়ে পড়ছে বেশি মূল্যের পোশাক

গোলাম মওলা
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২:০০ আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২:০০

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আয় ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বা প্রায় ৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তবে এই প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ এসেছে ট্রাউজার, সোয়েটার ও কার্ডিগান এবং টি-শার্ট ও ভেস্ট—এই তিন পণ্য থেকে। বিপরীতে, তুলনামূলক উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্য। কয়েকটি পণ্যের রফতানি কমেও গেছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, পোশাক রফতানি বাড়লেও বাংলাদেশের পণ্যভিত্তিক রফতানি কাঠামোতে সাধারণ পোশাকের আধিপত্য আরও বেড়েছে। অন্যদিকে, উন্নত ও বিশেষায়িত পোশাকের অংশ কমেছে।

প্রবৃদ্ধির ৮০ শতাংশ তিন পণ্যে

প্রথম প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রফতানিতে অতিরিক্ত যে আয় এসেছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে তিনটি পণ্য থেকে। এর মধ্যে ট্রাউজার রফতানি বেড়ে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ২০ কোটি ১০ লাখ ডলার। সোয়েটার ও কার্ডিগান থেকে এসেছে ১৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আর টি-শার্ট ও ভেস্ট রফতানি বেড়ে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

তিন পণ্য মিলিয়ে বাড়তি রফতানি আয় হয়েছে ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অথচ পুরো পোশাক খাতে একই সময়ে রফতানি বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে এসব পরিচিত পণ্যের ওপর ভর করে।

এতে বাংলাদেশের প্রচলিত পোশাক উৎপাদন ও রফতানির শক্তিশালী অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি যখন নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাধারণ পোশাকের দখল আরও বেড়েছে

প্রথম প্রান্তিকে সাধারণ বা বেসিক পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৮২৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল প্রায় ৭৬৯ কোটি ডলার। ফলে এ শ্রেণির পোশাকে রফতানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

মোট পোশাক রফতানিতে সাধারণ পোশাকের অংশও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট রফতানির ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ এসেছিল এ শ্রেণির পণ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশে।

অর্থাৎ দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় চার-পঞ্চমাংশই আসছে সাধারণ পোশাক থেকে। ট্রাউজার, সোয়েটার ও টি-শার্টের মতো পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি এ প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।

শিশুদের পোশাকের রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি। প্রথম প্রান্তিকে এ পণ্যের রফতানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা আলোচিত পণ্যশ্রেণিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। তবে এ খাতের মোট রফতানি আয় তুলনামূলক কম,৩০ কোটি ডলার।

শার্ট-ব্লাউজে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৭৭ শতাংশ

সাধারণ পোশাকের তুলনায় শার্ট ও ব্লাউজের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক কম। এ দুই পণ্যকে সেমি-বেসিক বা আধা-প্রচলিত পোশাক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

প্রথম প্রান্তিকে শার্ট ও ব্লাউজ রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

মোট পোশাক রফতানিতে এ শ্রেণির অংশও কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শার্ট ও ব্লাউজের অংশ ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে।

এ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, পোশাক রফতানির সব শ্রেণিতে সমান গতিতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। সাধারণ পোশাক যেখানে তুলনামূলক দ্রুত এগোচ্ছে, সেখানে শার্ট ও ব্লাউজের রফতানি বাড়ছে ধীরগতিতে।

উচ্চমূল্যের পোশাকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৪২ শতাংশ

তুলনামূলক উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের রফতানি প্রবৃদ্ধি আরও কম। প্রথম প্রান্তিকে এ শ্রেণির পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১৪৮ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থের হিসাবে বাড়তি আয় প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এ শ্রেণির পণ্যের মধ্যে রয়েছে আউটারওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যার এবং স্যুট ও এনসেম্বলস।

এর মধ্যে আউটারওয়্যার রফতানি থেকে অতিরিক্ত আয় এসেছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। টেকনিক্যাল ওয়্যারে বেড়েছে আরও ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রফতানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সীমিত থেকেছে।

প্রথম প্রান্তিকে ড্রেসের রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যারে কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর স্যুট ও এনসেম্বলসের রফতানি কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

ফলে মোট পোশাক রফতানিতে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্যের অংশ কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ অংশ ছিল ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে।

রফতানি বাড়ছে, বৈচিত্র্য বাড়ছে কি?

প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সামনে দুটি চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে রফতানি আয় বাড়ছে, অন্যদিকে সেই প্রবৃদ্ধি প্রধানত প্রচলিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকছে। উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের রফতানি একই গতিতে বাড়ছে না।

ট্রাউজার, সোয়েটার ও টি-শার্টের মতো পণ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। তবে রফতানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে রফতানি বাড়াতে পারলে একই সঙ্গে নতুন পণ্যশ্রেণিতে অবস্থান শক্তিশালী করা এবং রফতানি আয়ের ভিত্তি বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সাধারণ পোশাকের অংশ বেড়েছে, বিপরীতে উচ্চমূল্যের পোশাকের অংশ কমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও পণ্যভিত্তিক কাঠামোয় বৈচিত্র্য বাড়ার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রফতানিতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ট্রাউজার, সোয়েটার ও টি-শার্টের মতো প্রচলিত কয়েকটি পণ্য থেকে। অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের রফতানি তুলনামূলক কম বেড়েছে। কয়েকটি পণ্যের রফতানি কমে যাওয়াও উদ্বেগের বিষয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না, পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চমূল্যের পোশাক, স্পোর্টসওয়্যার ও বিশেষায়িত পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য উদ্ভাবন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে প্রচলিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।’’

সব মিলিয়ে, প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো খাতটির জন্য ইতিবাচক। তবে বাড়তি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ যখন মাত্র তিনটি পণ্য থেকে আসে, তখন রফতানির প্রবৃদ্ধিকে আরও বিস্তৃত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
জাপানের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা
যে কাতার বাংলাদেশকে এলএনজি দিতো, তারাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা
সর্বশেষ খবর
শিশুদের সুরক্ষায় সংঘাত বন্ধের আহ্বান চীনের
শিশুদের সুরক্ষায় সংঘাত বন্ধের আহ্বান চীনের
বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন বাড়াতে সিমেন্স ইডিএর পরিবেশক পেন্টা গ্লোবাল
বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন বাড়াতে সিমেন্স ইডিএর পরিবেশক পেন্টা গ্লোবাল
শিক্ষার্থীদের জন্য চার নতুন বই, এইচএসসির ফল ৩১ অক্টোবর
শিক্ষার্থীদের জন্য চার নতুন বই, এইচএসসির ফল ৩১ অক্টোবর
মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
সর্বাধিক পঠিত
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’