বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, বিশ্ববাজার থেকে সরাসরি অর্থ সংগ্রহ। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভরশীল সরকার এবার আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম (সভরেন) বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা যাচাই শুরু করেছে।
সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা নয়, বরং দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তেমনই ভুল পরিকল্পনা হলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যুর উপযোগিতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি কোন বাজারে, কোন মুদ্রায়, কত পরিমাণ এবং কী ধরনের বন্ড ইস্যু করা হবে— সেসব বিষয়ে সুপারিশ দেবে।
কেন এখন এই সিদ্ধান্ত
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সরকারের সামনে এখন অর্থায়নের চাপ বাড়ছে। একদিকে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, অপরদিকে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও আগের মতো সহজ শর্তে অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি ছাড়েও বিলম্ব হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সরকার বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকের অর্থের বড় অংশ সরকারি খাতে চলে যায়। ফলে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য ঋণ কমে যায়। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
‘সার্বভৌম বন্ড’ আসলে কী
সাধারণভাবে কোনও দেশের সরকার যখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ নিতে বন্ড ইস্যু করে, সেটিই হলো সার্বভৌম বা সভরেন বন্ড।
বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অর্থ দেন, আর সরকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুদ (কুপন) পরিশোধ করে শেষে মূলধন ফেরত দেয়। অর্থাৎ এটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরকারের সরাসরি ঋণ নেওয়ার একটি পদ্ধতি।
সরকারের হিসাব কী
অর্থ বিভাগের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, বন্ড থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তা এমন খাতে ব্যবহার করতে হবে— যেখান থেকে অর্জিত অর্থনৈতিক সুবিধা বন্ডের সুদ, স্প্রেড, ফি এবং অন্যান্য ব্যয়ের চেয়ে বেশি হবে। অর্থাৎ শুধু ঋণ নিলেই হবে না, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে কতটা আয় সৃষ্টি করবে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কোন মুদ্রায় হবে বন্ড?
বৈঠকে দুটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটি হচ্ছে মার্কিন ডলারে প্রচলিত আন্তর্জাতিক বন্ড। অন্যটি হচ্ছে চীনের মুদ্রা রেনমিনবিতে ‘পান্ডা বন্ড’। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের মতে, প্রথম ধাপে বড় অঙ্কের পরিবর্তে মাত্র ৫০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বন্ড ইস্যু করা যেতে পারে। এতে বাজারের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাবে এবং ঝুঁকিও সীমিত থাকবে।
অপরদিকে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার ছিদ্দিকীর মত হলো, বাংলাদেশ চাইলে চীন ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যুতে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তবে বৈঠকে বেশিরভাগ কর্মকর্তার মত ছিল, প্রথম বন্ডটি ডলারে ইস্যু করাই বাস্তবসম্মত হবে। কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারভিত্তিক বন্ডের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
বড় বাধা ঋণমান
আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড বিক্রি করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। আর সেই আস্থার বড় ভিত্তি হচ্ছে দেশের সার্বভৌম ঋণমান (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং)। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, নতুন করে অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল্যায়ন করাতে হবে। সম্প্রতি ফিচ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘ঋণাত্মক’ করেছে। যদিও মূল রেটিং ‘বি প্লাস’ অপরিবর্তিত রয়েছে। ঋণমান যত দুর্বল হবে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ তুলতে তত বেশি সুদ দিতে হবে।
কেন এতদিন পিছিয়ে ছিল পরিকল্পনা?
বাংলাদেশে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর আলোচনা নতুন নয়। ২০১২ সালেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সে সময় ইউরোপে গ্রিসের ঋণ সংকট এবং পরে শ্রীলঙ্কার ঋণ বিপর্যয় সরকারের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করে।
বিশেষ করে ২০২২ সালে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে শ্রীলঙ্কা যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, সেটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে ওঠে। ফলে পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক বন্ড বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে তাঁর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে— ভবিষ্যতে এই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত মুনাফা, মুদ্রা ঝুঁকি এবং সামগ্রিক ব্যয় ভালোভাবে মূল্যায়ন না করলে ভবিষ্যতে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।’’
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, আইএমএফ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকি ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোও দেশের ঋণমান নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছে।
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বন্ডের প্রস্তাব
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হকের মতে, সাধারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পরিবর্তে প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে বন্ড ইস্যু করলে তা দেশের জন্য আরও লাভজনক হতে পারে। তাঁর যুক্তি, এতে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ হবে। রিজার্ভ শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারজনিত ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকবে।
সরকারের ঋণের চাপ কতটা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সরকারের মোট দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী
‘সার্বভৌম বন্ড’ ইস্যুর বিষয়টি অনেকের কাছে কেবল অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি কারিগরি সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে।যদি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম সুদে অর্থ সংগ্রহ করা যায়, তাহলে সরকার ব্যাংক থেকে কম ঋণ নেবে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে যদি উচ্চ সুদে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয় এবং সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই ঋণ শোধ করতে সরকারকে আরও বেশি কর আরোপ, ব্যয় সংকোচন কিংবা নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের আগে সরকারের উচিত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা— শক্তিশালী সার্বভৌম ঋণমান, সুস্পষ্ট ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল, উৎপাদনশীল খাতে অর্থ ব্যবহারের নিশ্চয়তা, মুদ্রা ও সুদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ড নতুন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। তবে এটি হবে দেশের অর্থনীতির জন্য এক নতুন পরীক্ষা। সঠিক পরিকল্পনা ও বিচক্ষণ বাস্তবায়ন হলে এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর উৎসে পরিণত হতে পারে। আর ভুল সিদ্ধান্ত হলে শ্রীলঙ্কার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়াতে পারে।









