গাজীপুরের ট্রাউজার ল্যান্ড নামে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন শ্রমিক ওয়াহিদ নাহিদ হোসেন। গত ঈদুল আজহার দিনও রাত তিনটা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু উৎপাদন সংকটে বন্ধের উপক্রম হওয়া কারখানাটি এখনও তাঁর বকেয়া বেতন পরিশোধ করেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে নতুন চাকরির খোঁজ করে কোনও কাজ জোটাতে পারেননি তিনি।
পরিবারের খরচ সামলাতে তাঁর স্ত্রী বাধ্য হয়ে নিজের স্বর্ণের কানের দুল বিক্রি করেছেন। অর্থাভাবে স্কুলপড়ুয়া ছেলের কোচিংও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে ওয়াহিদ নাহিদ হোসেন বলেন, “তিন মাস ধরে বাসা ভাড়া বকেয়া। দুই মাস ধরে পাড়ার দোকানেও বাকিতে সংসার চালাচ্ছি। অনেক জায়গায় চাকরি খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও কাজ পাচ্ছি না।”
শুধু ওয়াহিদ নাহিদ হোসেন নন, একই কারখানার শত শত শ্রমিক এখন বেকার। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় তারা নতুন কাজের সন্ধানে এক কারখানা থেকে আরেক কারখানায় ঘুরছেন, কিন্তু অনেকেরই ভাগ্যে চাকরি জুটছে না।
ওয়াহিদের কণ্ঠে ফুটে ওঠেছে শ্রমজীবী মানুষের কঠিন বাস্তবতা। তিনি বলেন, “সংবাদে দেখি অর্থনীতি নাকি ভালো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ঘরে তো সেই ভালো থাকার কোনও খবর আসেনি।”
এই একজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতাই আজ দেশের হাজারো শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ছোট ব্যবসায়ীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমার ইঙ্গিত মিলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে এবং দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতার পর জুন মাসে রফতানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে। সরকার নতুন বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
কিন্তু এই ইতিবাচক সংকেতের বিপরীতে বাস্তব অর্থনীতির চিত্র এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার গতি কমেছে, অনেক উদ্যোক্তা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন ঘটেছে এবং একের পর এক শিল্পকারখানা উৎপাদন কমাচ্ছে কিংবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির সুফল কি বাস্তব অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারছে?
পরিসংখ্যানের বাইরে বাস্তব অর্থনীতির চিত্র
অর্থনীতির স্বাস্থ্য মূল্যায়নে সাধারণত মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ, রফতানি, প্রবাসী আয় কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতো সূচক বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সূচকের উন্নতি সব সময় বাস্তব অর্থনীতির উন্নতির সমার্থক নয়। প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য দেখতে হয় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা, শিল্পকারখানা সম্প্রসারিত হচ্ছে কিনা, ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়ছে কিনা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা। এসব সূচকের অধিকাংশই বর্তমানে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখন অর্থের নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। ভবিষ্যৎ বাজার, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অধিকাংশ উদ্যোক্তা নতুন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। অনেকেই নতুন প্রকল্পে যাওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
একজন শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তার ভাষায়, ‘‘এখন লাভের চিন্তার আগে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’’
বিনিয়োগ থেমে গেলে থেমে যায় অর্থনীতির গতি
অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদন বৃদ্ধি, রফতানি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান—সব কিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে বিনিয়োগ।
ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে শিল্পায়নের গতি বাড়িয়েছে। এর সুফল হিসেবে তারা শুধু রফতানিই বাড়ায়নি, বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশও দীর্ঘদিন একই পথে এগিয়েছে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতের বিকাশের পেছনে ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই গতি স্পষ্টভাবে শ্লথ হয়েছে।
উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাজারের দুর্বল চাহিদা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা এখন নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে ঝুঁকি কমানোর কৌশল বেছে নিচ্ছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মূলত কাঠামোগত। শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো বা সামষ্টিক সূচকের উন্নতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ফিরবে না। ব্যাংকিং খাত, করব্যবস্থা, বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং ব্যবসার ব্যয় কমাতে সমন্বিত সংস্কার জরুরি।’’
তার মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু কর-সুবিধা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা, শক্তিশালী আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিচালনার পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ খুঁজছেন।
ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি কী বার্তা দিচ্ছে
বাস্তব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। উদ্যোক্তারা যখন নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ান, তখন তার প্রতিফলন দেখা যায় ব্যাংকঋণের চাহিদায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা গত এক দশকের অন্যতম সর্বনিম্ন। পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের ডিসেম্বরের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
কয়েক মাস আগেও ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা ছিল তারল্য সংকট। এখন ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহী নন। কারণ, বর্তমান সুদের হার অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন প্রকল্পের ঝুঁকিও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি অর্থের সংকট নয়, বরং আস্থার সংকট। উদ্যোক্তারা যখন ভবিষ্যৎ বাজার সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখেন।
রফতানিতে স্বস্তি, কিন্তু সতর্ক থাকার কারণও আছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের রফতানি আয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দীর্ঘ সময়ের দুর্বলতার পর এমন প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি মাসের ভালো ফল দিয়ে পুরো অর্থনীতির গতিপথ বিচার করা ঠিক হবে না। মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অনেক সময় নিম্ন ভিত্তি, কার্যদিবসের সংখ্যা কিংবা মৌসুমি কারণেও বেড়ে যেতে পারে। তাই পুরো অর্থবছরের ধারাবাহিক চিত্র বিবেচনা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের তথ্য বলছে, দেশের মোট পণ্য রফতানিতে উল্লেখযোগ্য গতি তৈরি হয়নি। মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘‘এক মাসের ভালো রফতানি পরিসংখ্যানকে স্থায়ী পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ এখনও অস্থির, আর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, দ্রুত বন্দরসেবা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে রফতানির ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা কঠিন হবে।’’
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন শুধু অর্ডারের সংকটে নয়, বিনিয়োগের একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সরবরাহ সক্ষমতা, জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং পরিবেশসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থাকে। কিন্তু দেশে উচ্চ সুদহার, গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রযুক্তি, সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী পণ্যে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ, নতুন বিনিয়োগ ছাড়া নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না, আর কর্মসংস্থান না বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির গতি টেকসইভাবে ফিরে আসবে না।”
বিদেশি বিনিয়োগ কেন কমছে
দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) একটি অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ বিদেশি বিনিয়োগ শুধু মূলধনই আনে না; প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং নতুন বাজারও নিয়ে আসে।
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কর-সুবিধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ বন্দর, দ্রুত কাস্টমস সেবা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তাকে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী অপেক্ষার অবস্থানে রয়েছেন।
ভিয়েতনাম থেকে শেখার কী আছে
দুই দশক আগে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক সূচক কাছাকাছি ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক নীতি, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নীতির মাধ্যমে ভিয়েতনাম এখন বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য ও উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্পে তারা বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির ঘোষণা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন ঘোষণা নয়; বরং কার্যকর বাস্তবায়ন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলাফলকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ কিংবা চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে গেলে অর্থনীতির আরেকটি বাস্তব চিত্র দেখা যায়। কোথাও কারখানার ফটকে ঝুলছে ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ’ নোটিশ, কোথাও উৎপাদন কমে যাওয়ায় একটি শিফট বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও নতুন নিয়োগ পুরোপুরি স্থগিত।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে প্রায় ৪৬০টি শিল্পকারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া, প্লাস্টিক, সিরামিক ও হালকা প্রকৌশল শিল্প।
তবে উদ্বেগের বিষয় শুধু বন্ধ কারখানা নয়। চালু থাকা অনেক কারখানাও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন ক্রয়াদেশের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানির অনিশ্চয়তায় অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নিয়ে চলছে।
একজন মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তার ভাষায়, “আমরা এখন লাভের জন্য নয়, বাজার ও দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখার জন্য উৎপাদন করছি। একবার কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে আবার চালু করা অনেক কঠিন।”
জ্বালানি সংকট ও উচ্চ ব্যয়ে বাড়ছে চাপ
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধা জ্বালানির অনিশ্চয়তা। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এখনও পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ নেই। কোথাও কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কোথাও বিদ্যুতের বিঘ্ন উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন শুধু ক্রয়াদেশ নয়; উৎপাদনের অনিশ্চয়তা। গ্যাসের নিম্নচাপ, বিদ্যুতের বিঘ্ন এবং উচ্চ সুদহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান খুব কম মুনাফায়, এমনকি লোকসান দিয়েও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।”
কর্মসংস্থানের ওপর বাড়ছে চাপ
বিনিয়োগ কমে গেলে প্রথম আঘাত পড়ে কর্মসংস্থানে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু নতুন শিল্প গড়ে না ওঠা এবং বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ না হওয়ায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
অপরদিকে গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ফলে অনেক পরিবার ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ভোগ্যপণ্য, ইলেকট্রনিকস, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে। অভ্যন্তরীণ বাজারের এই দুর্বল চাহিদাও নতুন বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
নেতিবাচক চক্রের ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি নেতিবাচক অর্থনৈতিক চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিনিয়োগ কমলে নতুন শিল্প হয় না, কর্মসংস্থান বাড়ে না, মানুষের আয় স্থবির থাকে, ভোগচাহিদা কমে যায়। এতে উদ্যোক্তারা আবারও নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে আসেন। ফলে অর্থনীতির গতি আরও মন্থর হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি একাই উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে না। বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে অগ্রগতি না হলে অর্থনীতি মাঝারি প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে থাকার ঝুঁকি থাকবে।”
বাজেট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
অন্যদিকে শিল্প পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন (প্রি-ফাইন্যান্স) স্কিমের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় বন্ধ ও অর্ধচলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে প্রকল্প নির্বাচন, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং কঠোর তদারকির ওপর। অতীতের মতো অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়া হলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি এবং বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং দক্ষ মানবসম্পদ চান। এসব ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করা গেলে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগই বাড়বে।”








