দামও কমছে, অর্ডারও কমছে—ইউরোপের বাজারে দ্বিমুখী চাপে বাংলাদেশের পোশাক খাত

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট  
১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১

বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। শুধু রফতানি আয়ই নয়, একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং ইউনিট মূল্য—তিনটি সূচকেই ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাবের চেয়ে বেশি; বরং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও পণ্যের মূল্যসংযোজন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা

মূল্য, পরিমাণ ও ইউনিট দাম—তিন সূচকেই পতন; প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ

দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রপ্তানি আয় হারিয়েছে বাংলাদেশ।

একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং কিছুটা মূল্যহ্রাস—দুই কারণই কাজ করেছে। বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে, অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একদিকে রফতানির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে কমছে পণ্যের দামও। ফলে আয় কমার চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। বরং দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে, যদিও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে।

ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ বরং বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ; সেখানে মূল ধাক্কা এসেছে ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায়। ভারতের ক্ষেত্রেও মূল্য ও পরিমাণ—দুই সূচকেই পতন রয়েছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অনেক কম। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই এত বড় মাত্রার পতন ঘটেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে; কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর এক মাসের সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশল নয়, বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে আরও জোর দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর পরিবর্তিত কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

/জিএম/এম/
সম্পর্কিত
সৌরপ্রযুক্তি রফতানিতে লাগাম টানতে চীনের নতুন উদ্যোগ
চার দফা দাবিতে রাজধানীতে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির মিছিল ও সমাবেশ
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক যাচ্ছে কম, দামও কম 
সর্বশেষ খবর
ইতিহাস গড়া নারী কাবাডি দল পেলো অর্থপুরস্কার
ইতিহাস গড়া নারী কাবাডি দল পেলো অর্থপুরস্কার
কাজের অপেক্ষায় লাখ লাখ তরুণ, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বব্যাংক
বাংলা ট্রিবিউন এক্সক্লুসিভ কাজের অপেক্ষায় লাখ লাখ তরুণ, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বব্যাংক
প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষক পেলেন ১২ কোটি টাকা
প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষক পেলেন ১২ কোটি টাকা
ফিক্সিংয়ের অভিযোগে বাংলাদেশ ও ভারতের ৭ জন নিষিদ্ধ
ফিক্সিংয়ের অভিযোগে বাংলাদেশ ও ভারতের ৭ জন নিষিদ্ধ
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ