ফেসবুক-গুগলের বিজ্ঞাপনে লাগাম টানতে নতুন নীতিমালা 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৩আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৩

বাংলাদেশে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার। ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য বিপণন, বিনোদন কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণা— সব ক্ষেত্রেই এখন ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, ইনস্টাগ্রামসহ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব ব্যাপক। কিন্তু এতদিন এই বিশাল বাজার পরিচালিত হয়েছে কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ছাড়াই। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়, বিদেশি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, ভোক্তা সুরক্ষা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল।

এই বাস্তবতায় প্রথমবারের মতো ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খসড়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধন ছাড়া বিদেশি কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। একই সঙ্গে তাদের ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে। শুধু বিজ্ঞাপন নয়, অনলাইনে বাংলাদেশে কোনও পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অপরদিকে ডিজিটাল বাণিজ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই বিধান বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে নতুন নিয়ম কী?

খসড়া নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো— বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচারের আগে বিদেশি ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে।

অর্থাৎ মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম), গুগল, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্য কোনও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন বিক্রি করতে চাইলে তাদের নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। এরপর দেশের প্রচলিত আইন, ভ্যাট ও করনীতি অনুসরণ করেই বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে।

সরকারের মতে, এতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিনের রাজস্ব ফাঁকিও কমবে।

কেন এই নীতিমালা?

বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন টেলিভিশন বা পত্রিকার তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপন দিতে।

কিন্তু এসব বিজ্ঞাপনের বড় অংশের অর্থ বিদেশে চলে গেলেও তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকারের কাছে নেই। ফলে প্রকৃত বাজারের আকার, কর আদায় কিংবা লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এই খাতকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।

সরকারের রাজস্ব বাড়বে কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন পরিচালিত হয়, তার একটি বড় অংশ থেকেই সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব পায় না।

নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলে— বিজ্ঞাপন বিক্রির সঠিক তথ্য সরকারের কাছে থাকবে; ভ্যাট ও আয়কর আদায় সহজ হবে; বিদেশে অর্থ পাচার বা অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহ কমবে ও বাজারের প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও আনুষ্ঠানিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে।

শুধু বিজ্ঞাপন নয়, অনলাইন ব্যবসাতেও নতুন শর্ত

নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি কোনও প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চাইলে তাদেরও ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকেও বাংলাদেশের আইন, করব্যবস্থা ও ভোক্তা সুরক্ষা বিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।

ক্রস-বর্ডার এসক্রো সেবা আসছে

আন্তর্জাতিক অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো— অর্থ পরিশোধের পর পণ্য না পাওয়া অথবা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ।

এই ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ক্রস-বর্ডার এসক্রো সেবা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এই ব্যবস্থায় ক্রেতার অর্থ সরাসরি বিক্রেতার কাছে যাবে না। পণ্য বা সেবা ঠিকভাবে সরবরাহ হওয়ার পর অর্থ বিক্রেতার কাছে পৌঁছাবে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয় পক্ষের নিরাপত্তা বাড়বে।

নিষিদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনে কঠোর অবস্থান

খসড়া নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— নকল ও ভেজাল পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না; প্রতারণামূলক বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকবে; অনলাইন জুয়া, বেটিং ও লটারির প্রচারণা করা যাবে না ও আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ পণ্য বা সেবার ডিজিটাল বাণিজ্যও বন্ধ থাকবে।

এছাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করার সুযোগও সীমিত করা হবে।

ভোক্তা সুরক্ষায় নতুন বিধান

অনলাইনে কেনাকাটায় প্রতারণা কমাতে একাধিক নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

যদি কোনও পণ্য— নকল হয়, ত্রুটিপূর্ণ হয়, চুক্তির সঙ্গে না মেলে, কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। 

তাহলে বিক্রেতাকে সেই পণ্য ফেরত নিতে হবে এবং একই পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে হবে।

একই সঙ্গে বিক্রয়োত্তর সেবা, ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি ও রিফান্ড নীতিও আগে থেকেই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ

নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করা।

এ জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে— পার্সেলভিত্তিক রপ্তানিতে বিশেষ সহায়তা, আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানে সহযোগিতা, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রফতানি আয়ে সম্ভাব্য আর্থিক প্রণোদনা ও বিদেশে প্রসেসিং সেন্টার ও ওয়্যারহাউস স্থাপনে নীতিগত সহায়তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ছোট উদ্যোক্তারাও সহজে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারবেন।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার কত বড়?

সরকারের কাছে এখনো নির্ভুল পরিসংখ্যান না থাকলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রতিবছর দুই অঙ্কের হারে বাড়ছে। বাংলাদেশেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপন ব্যয়ের বড় অংশ এখন ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগলমুখী।

এই বাজারকে আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা প্রণয়নই শেষ কথা নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন।

বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে স্থায়ী অফিস নেই। ফলে তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা, তথ্য আদায়, কর পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং আইন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য হবে।

এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই নীতিমালা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।

জনমত গ্রহণ শেষে চূড়ান্ত হবে নীতিমালা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত খসড়া নীতিমালার ওপর জনমত গ্রহণ করবে। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে এটি চূড়ান্ত করা হবে। 

উল্লেখ্য, ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবসা ও বিজ্ঞাপন পরিচালনা এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে এতদিন কোনো সমন্বিত নীতিমালা ছিল না। ফলে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিপুল ব্যবসা করলেও সরকারের রাজস্ব আদায়, ভোক্তা সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন ছিল।

নতুন নীতিমালা সেই শূন্যতা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, ডিজিটাল বাজার আরও শৃঙ্খলিত হবে, আন্তর্জাতিক ই-কমার্সে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারাও বৈশ্বিক বাজারে নতুন সুযোগ পাবেন। তবে নীতিমালার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে—বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে এই কাঠামোর আওতায় আনা যায় এবং আইন বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর।

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
সেলফি দিয়েই ফেসবুক হবে ভেরিফায়েড, লাগবে না টাকা
আবারও ‘গুজবে’ তেলের পাম্পে শত শত মোটরসাইকেল, প্রশাসনের মাইকিং
তথ্যমন্ত্রীর নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ, মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা
সর্বশেষ খবর
মিথ্যা তথ্যে একের পর এক চাকরি, ‘সিক লিভ’ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ: ব্রিটিশ বাংলাদেশির জেল
মিথ্যা তথ্যে একের পর এক চাকরি, ‘সিক লিভ’ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ: ব্রিটিশ বাংলাদেশির জেল
কৃত্রিম বন্যার কবলে কয়েকশ পরিবার, হাজারো মানুষের ভোগান্তি
কৃত্রিম বন্যার কবলে কয়েকশ পরিবার, হাজারো মানুষের ভোগান্তি
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই টেক স্কিল ডেভেলপমেন্ট: কেন, কীভাবে শুরু করবেন?
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই টেক স্কিল ডেভেলপমেন্ট: কেন, কীভাবে শুরু করবেন?
সকালের নাশতায় বানিয়ে ফেলুন মচমচে সুজির পুরি
সকালের নাশতায় বানিয়ে ফেলুন মচমচে সুজির পুরি
সর্বাধিক পঠিত
রান্নার সময় মাংস কেন সবুজ হলো, নতুন কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞ
রান্নার সময় মাংস কেন সবুজ হলো, নতুন কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞ
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে করণীয় কী জানালেন আইনমন্ত্রী 
রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে করণীয় কী জানালেন আইনমন্ত্রী 
পদত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যা বললেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
পদত্যাগ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যা বললেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী
মোদির এক ভিডিও ভেঙে দিলো ইনস্টাগ্রামের সব রেকর্ড
মোদির এক ভিডিও ভেঙে দিলো ইনস্টাগ্রামের সব রেকর্ড
৩ নেতা একসাথে হলে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সরকারের পতন: কর্নেল অলি আহমদ
৩ নেতা একসাথে হলে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সরকারের পতন: কর্নেল অলি আহমদ