টুথপেস্টসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে কোনও বেসরকারি সংস্থা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা এবং বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা। একইসঙ্গে এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক গণশুনানিতে বক্তারা এসব দাবি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. সাইফুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসটিআইয়ের পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম।
গণশুনানিতে বিএসটিআই মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ‘‘প্রতিটি গবেষণাকেই বিএসটিআই গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে এবং দেশে মানসম্পন্ন গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তবে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এমনভাবে হওয়া উচিত নয়, যাতে জনমনে অযথা আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।’’ তিনি বলেন, ‘‘টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, তার ফলাফল প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসটিআইকে অবহিত করা হলে তা আরও সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য হতো।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ বিশ্বের কোনও স্বীকৃত মানদণ্ডেই এ উপাদানের গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মান যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।’’
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফল সব সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে— এমন নিশ্চয়তা থাকে না। তাই গবেষণা প্রকাশের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা বা যাচাই করা হলে বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হবে।
স্কয়ার গ্রুপের লিগ্যাল অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সিনিয়র লিগ্যাল কাউন্সেল মো. সোহেল হোসেন বলেন, ‘‘টুথপেস্ট বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতাভুক্ত একটি পণ্য। ফলে এ ধরনের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে বিএসটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। এতে প্রকৃত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকতো এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি ও ব্যবসায়িক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।’’
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের আন্তর্জাতিক বিপণনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. শফিকুর রহমান ভূঁইয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘‘কয়েকটি বেকারি পণ্যে পটাশিয়াম ব্রোমেট থাকার দাবি করা হলেও পরে বিএসটিআই ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষায় ওই উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর আগেই নেতিবাচক প্রচারণার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ব্যবসার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’’
বক্তারা বলেন, অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন গবেষণা প্রকাশের ফলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা বা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়, যা ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বাজার ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই ভোক্তা সুরক্ষার পাশাপাশি শিল্প খাতের স্বার্থ রক্ষায় গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
গণশুনানিতে বিএসটিআইয়ের সেবা আরও সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করার লক্ষ্যে কয়েকটি প্রস্তাবও উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু, সব ধরনের আবেদন ও প্রয়োজনীয় নথি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ, নতুন লাইসেন্সের পাশাপাশি নবায়নের আবেদনও অনলাইনে গ্রহণ, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য গ্রোয়িং-আপ মিল্কের বাংলাদেশ মান প্রণয়ন এবং মোড়কজাত পণ্যের আইন ও বিধিমালার কয়েকটি ধারা সময়োপযোগী করার উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, নেসলে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, ট্রান্সকম কনজ্যুমার প্রোডাক্টস, আকিজ রিসোর্স, নিউজিল্যান্ড ডেইরি বাংলাদেশ, এসিআই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মেরিকো বাংলাদেশ, মেঘনা গ্রুপ, রেকিট বেনকিজার, আরলা ফুডস বাংলাদেশ, ইফাদ গ্রুপ, নাবিস্কো বিস্কিট ও মেগা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক: টুথপেস্ট না গেলার পরামর্শ বিএসটিআই’র
টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কী করবেন







