দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২ আগস্ট থেকে নতুন হার কার্যকর হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— এর সুফল কি সাধারণ মানুষও পাবেন, নাকি এর সুবিধা কেবল ব্যাংক ও বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমছে না। ফলে ঋণের সুদ সামান্য কমলেও যদি খাদ্য, বাসাভাড়া, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম না কমে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত স্বস্তি আসবে না।
কেন কমানো হলো নীতি সুদহার
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন উচ্চ সুদহার থাকার কারণে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যায়। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদনে বিনিয়োগে অনেক উদ্যোক্তা পিছিয়ে যান। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, নীতি সুদহার কমালে ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদও ধীরে ধীরে কমবে। এতে উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারেন।
সাধারণ মানুষের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে
নীতি সুদহার কমানোর সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল হলো ঋণের সুদ কমে আসা। তবে এটি রাতারাতি হবে না। ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কমতে শুরু করলে ধাপে ধাপে ব্যবসায়িক ঋণ, গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ এবং ব্যক্তিগত ঋণের সুদ কিছুটা কমতে পারে।
এর ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা সহজ হতে পারে। শিল্পকারখানায় নতুন বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয়ও বাড়তে পারে। অর্থাৎ নীতি সুদহার কমানোর প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ পাবেন তখনই, যখন এটি নতুন বিনিয়োগ ও চাকরি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
তবে এর জন্য সময় লাগবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব অর্থনীতিতে পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনও মূল্যস্ফীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো মূল্যস্ফীতি। টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করছে। কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। খাদ্যপণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারকে তাদের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি শুধু খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় অনেকের প্রশ্ন— যখন মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ, তখন কেন নীতি সুদহার কমানো হলো?
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, দীর্ঘদিন কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর নীতি সুদহার কমানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে শুধু সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে কিংবা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে— এমনটি মনে করার সুযোগ নেই।
তার ভাষায়, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ অতিরিক্ত চাহিদা নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের চাপ, জ্বালানি সংকট, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং পণ্য সরবরাহে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা।
তিনি বলেন, যদি এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না হয়, তাহলে সুদের হার কমে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও উৎপাদন না বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়তে পারে।
শুধু সুদ কমলেই কি বিনিয়োগ বাড়বে?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের সুদ বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো— নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, করব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় প্রভৃতি।
এসব সমস্যার সমাধান না হলে সুদের হার অর্ধ শতাংশ কমলেও বড় ধরনের বিনিয়োগ বাড়বে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্যাংক গ্রাহকদের কী লাভ হবে
ব্যাংকারদের মতে, নীতি সুদহার কমার ফলে আগামী কয়েক মাসে ব্যাংক ঋণের সুদ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে আমানতের সুদও কিছুটা কমবে।
অর্থাৎ যারা ঋণ নেবেন তারা কিছুটা সুবিধা পেলেও যারা ব্যাংকে সঞ্চয় রাখেন, তাদের সুদ আয় কমে যেতে পারে। ফলে নীতি সুদহার কমানোর সুবিধা ও অসুবিধা— দুই দিকই রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য কী
বর্তমান সরকার বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত গতিশীল করতে চায়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাহলে সাধারণ মানুষ কি সত্যিই লাভবান হবেন?
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরটি নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
যদি ব্যাংক ঋণের সুদ কমে, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ আয় বাড়ার মাধ্যমে এর সুফল পাবেন।
কিন্তু যদি মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানেই থাকে, বাজারে কারসাজি অব্যাহত থাকে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ডলারের অস্থিরতা ও ব্যবসার অনিশ্চয়তা দূর না হয়, তাহলে নীতি সুদহার কমানোর সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি পৌঁছাবে না।
ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত
নীতি সুদহার কমানো নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা ইতিবাচক সংকেত এবং ঋণনির্ভর বিনিয়োগের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসার কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান ছাড়া শুধু সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, নীতি সুদহার কমানো একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু এটি কোনও ‘ম্যাজিক সমাধান’ নয়। সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রকৃত সুফল তখনই পৌঁছাবে, যখন কম সুদের সঙ্গে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পাবে।

চুলা জ্বলে না, জ্বলছে দুশ্চিন্তার আগুন







