ব্যাংক-পুঁজিবাজারের লুটপাটে এপিজির উদ্বেগ, সামনে বাংলাদেশের বড় পরীক্ষা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট  
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২ আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২

এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিং—এপিজির প্রিলিমিনারি মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্ল্যানিং (পি-এমইপি) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিন দিনের সফরে এপিজির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের আসন্ন মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতি, অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ এবং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য কার্যক্রম চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

১১ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত এপিজির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। এ সময় অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তবে এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে গত সরকারের আমলে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যাপক অর্থ লুটপাট এবং বিদেশে অর্থপাচার। এসব ঘটনা বাংলাদেশের আগামী মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এপিজি প্রতিনিধি দল।

একই সঙ্গে আর্থিক খাত সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বর্তমান সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে তারা। এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখারও সুপারিশ করেছে প্রতিনিধি দল।

সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বার্তা

পি-এমইপির অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এবং এপিজি প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় অর্থমন্ত্রী মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী অর্থায়ন এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দেশের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

এনসিসির সদস্যরা মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতি এবং নিজ নিজ দপ্তরের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে এপিজি প্রতিনিধিদের অবহিত করেন।

অপরদিকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বাস্তব দিক, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ব্যাংক-পুঁজিবাজারের লুটপাট নিয়ে এপিজির উদ্বেগ

পি-এমইপি সফরের আলোচনায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে গত সরকারের সময়ে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যাপক লুটপাট এবং বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়গুলো নিয়ে এপিজি প্রতিনিধি দল উদ্বেগ প্রকাশ করে।

প্রতিনিধি দলের আশঙ্কা, এসব ঘটনা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থপাচারের বিষয়গুলো আগামী মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনে বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে একইসঙ্গে আর্থিক খাতে সংস্কার কার্যক্রম, সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং বিদেশে পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে এপিজি। এসব সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

বিভিন্ন সংস্থার সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রস্তুতি

তিন দিনের কর্মসূচিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সভা করেছে এপিজি প্রতিনিধি দল। এসব সভায় মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের বিভিন্ন ইমিডিয়েট আউটকাম বা তাৎক্ষণিক ফলাফলভিত্তিক সূচক নিয়ে আলোচনা হয়।

বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা এসব আলোচনায় অংশ নেন।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কাস্টমস, সীমান্ত ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।

আলোচনায় বাংলাদেশের আগের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনে উঠে আসা পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি, বর্তমান সক্ষমতা এবং আগামী মূল্যায়নের আগে কোন কোন ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

বেসরকারি খাতকেও প্রস্তুতির বার্তা

সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পৃথক অধিবেশন করেছে এপিজি প্রতিনিধি দল। এতে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও, এনপিওসহ বিভিন্ন রিপোর্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নয়, বেসরকারি আর্থিক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নীতিমালা, নজরদারি, গ্রাহক যাচাই এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থার বিষয়ে প্রস্তুত থাকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

কর্মসূচির সমাপনীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিএফআইইউর প্রধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের প্রস্তুতি ও দেশের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে পুনরায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

২০২৭-২৮ মেয়াদে হবে মূল মূল্যায়ন

মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারে অর্থায়ন প্রতিরোধে কোনো দেশের সার্বিক অবস্থান ও সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াই মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে—মূল্যায়নে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়।

এপিজির অধীনে আগামী ২০২৭-২৮ মেয়াদে বাংলাদেশের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে চলতি পি-এমইপি সফরের মাধ্যমে মূল মূল্যায়নের প্রস্তুতি, অগ্রাধিকার এবং ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করার প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হলো।

বাংলাদেশ এর আগে ২০০২, ২০০৯ ও ২০১৬ সালে মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনের মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৯ সালের মূল্যায়নের পর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে সরকারের বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ওই তালিকা থেকে বের হয়ে আসে।

এরপর ২০১৬ সালের মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশনে এপিজি এবং এর ৪২টি সদস্য রাষ্ট্রের মূল্যায়নে বাংলাদেশ ‘কমপ্লায়েন্ট কান্ট্রি’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবারের মূল্যায়নের আগে বাংলাদেশের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আগের অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে ঘটে যাওয়া অনিয়ম, অর্থপাচার, দুর্নীতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পি-এমইপি সফরে এপিজির দেওয়া বার্তা থেকে স্পষ্ট, শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন নয়, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আগামী মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

/জিএম/ এম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
এসআরবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালালো দুর্বৃত্তরা, ৮ ককটেল উদ্ধার
এসআরবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালালো দুর্বৃত্তরা, ৮ ককটেল উদ্ধার
ক্যানসার আক্রান্ত পোপ লিও, কী ভাবছে ভ্যাটিকান
ক্যানসার আক্রান্ত পোপ লিও, কী ভাবছে ভ্যাটিকান
এবার যন্তর মন্তর থেকে নেহাকে আটক করলো দিল্লি পুলিশ
এবার যন্তর মন্তর থেকে নেহাকে আটক করলো দিল্লি পুলিশ
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
ভারতীয় তরুণীকে ৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি উপহার দিলেন মিস্টারবিস্ট
ভারতীয় তরুণীকে ৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি উপহার দিলেন মিস্টারবিস্ট
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা