দেশের চামড়া শিল্পকে আবারও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনতে ট্যানারি খাতে সংস্কার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘অ্যাডভান্সিং বাংলাদেশ’স লেদার সেক্টর: চ্যালেঞ্জেস, অপারচিউনিটিস অ্যান্ড রিফর্ম’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘‘হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি, বরং শিল্পটি ক্ষতির মুখে পড়েছে।’’
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে বিনিয়োগ করলেও যারা এখন নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী বা সক্ষম নন, তাদের জন্য ‘গ্রেসফুল এক্সিট’-এর সুযোগ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য জায়গা তৈরি হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে ট্যানারি ব্যবসায় শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডাব্লিউজি) সনদ অর্জনের বিষয়টিকেও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।’’
কাঁচা চামড়া রফতানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাত করে জুতা, ব্যাগসহ উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য রফতানির ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘‘এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘বাংলাদেশ লেদার’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রয়েছে।’
সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নতুন বিশ্বমানের সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সিইটিপির সংস্কারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা ধরে প্রকল্পটি তৈরি হলেও কার্যকরভাবে ১৪ থেকে ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করা সম্ভব হচ্ছে। বড় ট্যানারিগুলোর জন্য নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে ছোট ট্যানারিগুলো কেন্দ্রীয় সিইটিপির সঙ্গে সমন্বয় করে শতভাগ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করবে।’’
ট্যানারির কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘এসব বর্জ্য থেকে ট্যালো, হাড়ের গুঁড়াসহ বিভিন্ন ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য কয়েকটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকাকে একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।’’
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাজার সম্প্রসারণে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্পেন ও ইতালির বড় চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘২০২৭ সালের মধ্যে সাভারে চামড়া ও অন্যান্য শিল্পের জন্য একটি দক্ষতা ও ডিজাইন উন্নয়ন কেন্দ্র চালুর লক্ষ্য রয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘দক্ষ জনবল তৈরি, ডিজাইন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, বিনিয়োগ সুবিধা, ইটিপি স্থাপন এবং বন্ডসংক্রান্ত জটিলতা দূর করার মাধ্যমে দেশের চামড়া শিল্পকে আবারও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন জানান, অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলীয় ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে। আলোচনায় আরও অংশ নেন ফ্ল্যাক্সা’র সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানসহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ট্যানারি ও পাদুকা উদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা।








