আবাসিক ভবনে সিগারেটের মজুত, সব কারবার রাতেই

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:১৮আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:১৮

রাজধানীর আবাসিক ভবনকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বিদেশি সিগারেটের ব্যবসা চালানোর চালাচ্ছিল। এমন অভিযোগে দুটি গোপন গুদামে অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ শলাকা সিগারেট জব্দ করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং ও জয়েন্ট কোয়ার্টার এলাকায় পৃথক দুটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে এসব সিগারেট জব্দ করা হয়। জব্দ করা সিগারেটের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৫ লাখ টাকা। এসব সিগারেটের বিপরীতে মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ বাবদ সরকারের প্রায় ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, মূল্য সংযোজন কর, ঢাকার দুটি প্রিভেন্টিভ টিম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালনা করে।

বাইরে আবাসিক ভবন, ভেতরে গোপন গুদাম

ভ্যাট গোয়েন্দার তথ্যমতে, বুধবার সকাল ১১টার দিকে গোয়েন্দা দলের সদস্যরা মোহাম্মদপুরের দুটি নির্দিষ্ট আবাসিক ভবনে একযোগে অভিযান শুরু করেন। সেখানে গিয়ে তারা দুটি গোডাউন বন্ধ অবস্থায় দেখতে পান।

গোডাউনের মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। পরে ভবনের দারোয়ানের সহযোগিতায় গোয়েন্দারা গোপন গুদাম দুটির অবস্থান নিশ্চিত করেন। চাবি সংগ্রহের চেষ্টা করেও তা না পাওয়ায় ভবন মালিকের সহায়তায় বাইরে থেকে মিস্ত্রি এনে তালা ভেঙে গুদামে প্রবেশ করা হয়।

তখনই বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সিগারেটের মজুত।

একটি গুদামে বস্তাভর্তি অবস্থায় পাওয়া যায় কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট। অন্য গুদামেও পাওয়া যায় অন্য ব্র্যান্ডের বিদেশি সিগারেট।

সব মিলিয়ে দুটি গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ শলাকা বিদেশি সিগারেট।

দিনের বেলা বন্ধ, রাতে চলে মালামাল আনা-নেওয়া

অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দা, দারোয়ান ও ভবন মালিকের সঙ্গে কথা বলে গুদাম দুটির কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা দল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গুদাম দুটি দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকতো। তবে রাতের দিকে সেখানে মালামাল আনা-নেওয়া হতো। পরে সেগুলো পার্সেল করে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।

গুদানের ভেতরে কী ধরনের পণ্য রাখা হয়, সে বিষয়ে ভবনের দারোয়ান কিছু জানতেন না। কারণ গুদাম ব্যবহারকারী সবাইকে বৈধ পণ্যের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দাদের কাছে দারোয়ান জানান, রাতের দিকে মালামাল আনা এবং বিভিন্ন জায়গায় পার্সেল পাঠানোই ছিল গুদামটির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। তবে সেগুলোর ভেতরে কী পণ্য থাকত, তা তিনি জানতেন না।

একই মালিকের দুটি গুদাম

অভিযানের সময় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, দুটি ভিন্ন ঠিকানায় গুদাম হলেও সেগুলোর প্রকৃত মালিক একই ব্যক্তি।

তিনি বৈধ ডিলারশিপ ব্যবসা করার কথা বলে গুদাম দুটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তবে সেখানে কী ধরনের পণ্যের ব্যবসা করা হবে, সে বিষয়ে ভবন মালিকদের বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ভবন মালিকদের দাবি, তারা বৈধ ব্যবসার জন্যই গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন। ভাড়াটিয়া অবৈধ বিদেশি সিগারেটের ব্যবসা করছেন— এ বিষয়ে তারা আগে কিছু জানতেন না।

অভিযানের পর ভবিষ্যতে গুদাম ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকার বিষয়ে তারা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন।

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছিল অবৈধ সিগারেট

ভ্যাট গোয়েন্দার প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় অবৈধ বিদেশি সিগারেট সরবরাহ করছিল।

গোপন গুদামে বিপুল পরিমাণ সিগারেট মজুত করে রাখা এবং রাতের বেলা কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর তথ্য পাওয়ায় এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধান চলছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় চোরাচালান চক্রটিকে শনাক্ত ও হাতেনাতে ধরার চেষ্টা চলছে।

৩০ লাখ টাকা রাজস্বের হিসাব

ভ্যাট গোয়েন্দার জব্দ তালিকা অনুযায়ী, উদ্ধার করা সিগারেটের বাজারমূল্য আনুমানিক ৩৫ লাখ টাকা। এসব সিগারেট বৈধভাবে আমদানি করা হলে সরকারকে মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব দিতে হতো।

অর্থাৎ, অবৈধ পথে এসব সিগারেট বাজারে ঢোকানো হলে শুধু বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, একই সঙ্গে সরকার হারায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

এর বাইরে অবৈধ সিগারেটের বাজার বিস্তৃত হলে তামাকপণ্যের ওপর সরকারের করনীতি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়।

অনুমতি ছাড়া বিদেশি সিগারেট আমদানি বেআইনি

এনবিআর জানিয়েছে, পূর্বানুমতি ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ ছাড়া বিদেশি সিগারেট আমদানি করা যায় না। ফলে জব্দ করা সিগারেটগুলো অবৈধ হওয়ায় সেগুলো জব্দ করে নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে।

পরে বিধি অনুযায়ী এসব সিগারেট ধ্বংস করা হবে। এ ঘটনায় মামলাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

আবাসিক ভবনে গুদাম—বাড়ির মালিকদের জন্যও সতর্কবার্তা

মোহাম্মদপুরের এই অভিযান শুধু অবৈধ সিগারেট উদ্ধারের ঘটনা নয়, আবাসিক ভবন কীভাবে অবৈধ পণ্য মজুত ও সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, সেটিও সামনে এনেছে।

বাড়ি বা ভবনের মালিকরা অনেক সময় ভাড়াটিয়ার ব্যবসার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই জায়গা ভাড়া দেন। কিন্তু সেই জায়গা ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য মজুত বা সরবরাহ করা হলে পরে আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে ভবন মালিকদের ভাড়াটিয়ার ব্যবসার ধরন, পণ্যের প্রকৃতি এবং গুদাম ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা, তামাকজাত পণ্যের অবৈধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ এবং জাল স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে দেশব্যাপী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে এনবিআর।

/জিএম/এফআর/
সম্পর্কিত
আবারও ৩ টাকা বাড়লো সিগারেটের দাম
ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরালের পর সেই নির্বাচন কর্মকর্তাকে বদলি
দুই দিন ধরে বিদ্যুৎহীন, অন্ধকারে ৭০ পরিবার
সর্বশেষ খবর
বাহিনীর নজরে ঢাবির সাবেক উপাচার্য মাকসুদ কামাল, পালানোর সুযোগ নেই
বাহিনীর নজরে ঢাবির সাবেক উপাচার্য মাকসুদ কামাল, পালানোর সুযোগ নেই
জ্বালানি সংকটে কোনও কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ সভাপতি
জ্বালানি সংকটে কোনও কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ সভাপতি
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়: প্রেস সচিব
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়: প্রেস সচিব
ঢাকায় বৃষ্টি, গরম কি কমবে?
ঢাকায় বৃষ্টি, গরম কি কমবে?
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ছে আরেকটি ট্রেন, যেখানে যেখানে থামবে
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাড়ছে আরেকটি ট্রেন, যেখানে যেখানে থামবে
কষ্টের গল্প শুনে সাত দিনেই চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী, শাকিল বললেন কল্পনাও করিনি
কষ্টের গল্প শুনে সাত দিনেই চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী, শাকিল বললেন কল্পনাও করিনি
কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই হাসপাতালে এনসিপির সাবেক নেতা তানভীর
কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই হাসপাতালে এনসিপির সাবেক নেতা তানভীর
ভারতীয় ইলিশ দেশীয় বলে বিক্রি, আড়তদারকে জরিমানা
ভারতীয় ইলিশ দেশীয় বলে বিক্রি, আড়তদারকে জরিমানা
হবু বরের কেমন সেলফি পছন্দ, জানালেন মিমি
হবু বরের কেমন সেলফি পছন্দ, জানালেন মিমি