“আমি এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত আছি, আমার যেমন প্রতিদিন ভাত খেতে হয় সেভাবেই আমার তেল প্রয়োজন হয়। এখন সাড়ে ৩টা বাজে, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর তেল পেলাম। ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। তার মানে আমাকে আবার কালকে লাইনে দাঁড়াতে হবে। এভাবে আমার প্রতিদিনই সময় নষ্ট হচ্ছে”, আবু বকর সিদ্দিকী এভাবেই তার ভোগান্তির কথা জানান।
রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে ফ্রোজেন ফুড ডেলিভারির কাজ করেন আবু বকর। মোটরসাইকেলযোগে ডেলেভারির কাজ করা এই যুবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শুধু যে সময় নষ্ট হচ্ছে তা না, আমার যে ডেলিভারির কাজ সেখানেও সময় মতো যেতে পারছি না। এখন আসলে আমার কিছু করার নেই। যেহেতু আমাকে প্রতিদিন বাইক নিয়ে বের হতে হয়, এটাই আমার রুজির অংশ। সেহেতু আমাকে কষ্ট করেই যেতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি আমাদের ট্যাংক ফুল করে তেল দিতো তাহলেও প্রতিদিন লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে হতো না। দুই বা তিন দিন পরে আসলেও চলতো।”
কেবল আবু বকরই না, যারা নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন তারা রয়েছেন তেল নিয়ে বিপাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে পেশাগত দায়িত্ব, কমছে আয়। দৈনন্দিন জীবিকার জন্য মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল এসব কর্মীরা বলছেন, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তারা বাধ্য হচ্ছেন কম কাজ করতে। যার প্রভাব পড়ছে তাদের পারিবারিক জীবনে।
ইরান যুদ্ধের জেরে গোটা বিশ্বেই জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রমাগতভাবে বাড়ছে দাম। সরকার থেকে সংকটের কথা অস্বীকার করা হলেও বাস্তবে জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যানবাহন চালকদের। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গোটা দেশেই এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছে। এমনকি, অনেক সময় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে।
ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা কমানোর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশও এই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন ক্লাস করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
আক্ষেপ-অভিযোগ জানিয়েছেন বাইকাররা
রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সীমিত সরবরাহে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি পেশার সঙ্গে যুক্ত এবং নানান পেশার হাজারো মানুষ।
তৌহিদুর রহমান নামে এক যুবক রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। রাইড শেয়ারিং থেকে যে আয় হয় তা দিয়েই চলে তার সংসার। তিনি বলেন, “আমার মতো যারা আছেন, এমন একজন বাইকারের প্রতিদিন গড়ে চার লিটার তেল লাগে। কিন্তু, সেটা তো আমরা পাচ্ছি না। তাহলে এখন আমরা কি করছি? বাধ্য হয়েই কম বাইক চালাচ্ছি। এর মানে আমাদের ইনকাম কমে যাচ্ছে। আর যদি তাই হয়, তাহলে আমার বাসার মানুষকে খাওয়াবো কি করে? আমাকে তো পরিবারকে দেখতে হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের হয়তো এখন ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু, তখন আবার যাত্রী কমে যাবে। সত্যি বলতে কি করার আছে আমার সেটাই বুঝতে পারছি না।”
মো. আল-আমিন কাজ করেন একটি ওষুধ কোম্পানির আওতায় ডেলিভারির কাজে। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিদিন বাইক মাস্ট লাগে। কিন্তু যে তেল দেয় তা দিয়ে চলতে পারি না। আমি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা পর তেল পেয়েছি ৩০০ টাকার। অনুরোধ করেছিলাম, ৫০০ টাকার দিতে। কিন্তু, দেয়নি। পরে আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। আবার দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৩০০ টাকার নিলাম। কিছু করার নেই, কারণ প্রতিদিন সময় পাওয়া যায় না।”
রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারির কাজ করেন মো. মুনির হোসেন। প্রতিদিনের কাজেই তাকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে হয়। তেল সংকট নিয়ে নিজের ভোগান্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার মোটামুটি প্রতিদিন তিন লিটার তেল লাগে। কিন্তু, আমি তো এটা সবসময় পাই না। তাই আমি সবসময় বাইকের রিজার্ভের দিকে লক্ষ্য রাখি। যাতে আমার কাজের ক্ষতি না হয়। কিন্তু, গত সপ্তাহে আমার রিজার্ভের তেল শেষের দিকে চলে যায়। তখন তেল নিতে গেলে দুই থেকে তিনশো মানুষের সিরিয়াল। আমি যদি ফুডের অর্ডার নেই তাহলে আমি সেটা দিয়ে বাসায় ফেরত যেতে পারবো না। তাই বাধ্য হয়েই আমার অ্যাপ বন্ধ করে দেয়।”
মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমানের অফিস বনানীতে। তিনি প্রতিদিন যাতায়াত করেন নিজের মোটরসাইকেলে। তিনি বলেন, “তেল নিতে গিয়ে আমাদের প্রতিনিয়তই ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। সারাদিন পরে অফিস শেষ করে আবার রাতে দুই থেকে তিন ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার এনার্জি থাকে না।”
মাহফুজুর বলেন, “সরকার বলছে তেলের কোনও ঘাটতি নেই। তাই যদি হয়, তাহলে কেন পাম্পগুলো থেকে এভাবে অল্প পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে। ঠিকঠাক মতো দিলেই তো আর আমাদের এমন সমস্যার মুখে পড়তে হয় না। আবার কিছু পাম্পে ফুল ট্যাংক তেল দেয় আবার অনেকে সেরকম দেয় না। আবার অনেক সময় পরিচিতদের বেশি দেয়, সবাইকে দেয়া না। এটা সরকারের নজরে আনা উচিত। নিয়ম যাতে সব জায়গায় সবার জন্য এক হয়।”
রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলীবাগের এক পাম্পে দেখা যায় তেল নিতে আসা এক বাইকারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা জড়িয়েছেন এক কর্মী। সামনে গেলে জানা যায় সবাইকে ৩০০ টাকার তেল দিলেও এক বাইকারকে ৫০০ টাকার তেল দিয়েছেন ওই পাম্পের কর্মী। পরে তেল নিতে আসা ওই বাইকারও নিতে চান ৫০০ টাকার তেল। কিন্তু, তা দিতে নারাজ কর্মী। এই নিয়েই শুরু হয় বাগবিতণ্ডা। পরে ৫০০ টাকার তেল নিয়ে বাইরে যান ওই বাইকার। কিন্তু, ঝামেলা এরপরেও কমে না। পরে আরেকজনও চেয়ে বসেন ৫০০ টাকার তেল। কিন্তু, তাকে দিতে অস্বীকৃতি জানায় পাম্পের কর্মীরা। পরে তিনি তেল না নিয়েই তেলের বুথের সামনেই মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। অবশেষে তাকেও দেওয়া হয় ৫০০ টাকার তেল।
তেল নিয়ে বের হয়ে কবির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নিজের পরিচিত বলে তাকে বেশি টাকার তেল দিবে আর আমরা জেনারেল পিপল বলে কম দিবে এটা কেমন কথা। আমিও তো দুই ঘণ্টা লাইনে ছিলাম, তাহলে আমি কেন পাবো না। নিয়ম হলে সবার জন্য এক হওয়া উচিত।”
পাম্পের কর্মীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আমার পরিচিত ছোট ভাই বলে বেশি দিয়েছিলাম।”
এমন নানান ঘটনা হরহামেশাই ঘটে চলছে নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনলোতে। উত্তপ্ত বাক্য ছোঁড়াছুঁড়ি হচ্ছে পাম্প কর্মী ও জ্বালানি নিতে আসা বাইকারদের মধ্যে।









