বিদ্যুৎ সংকটে দেশে বেড়েছে সোলার ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের বিক্রি

শেখ শাহরুখ 
১৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০০আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:২৭

দেশে প্রকট হচ্ছে জ্বালানি সংকট। পাশাপাশি বাড়ছে লোডশেডিংও। এর জেরে সোলার ও ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে। শহরের পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে গ্রামেও। ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 

রাজধানী গুলিস্তানের একটি সোলার সরঞ্জামের দোকানে বেসরকারি খাতের কর্মী মারুফ মোরশেদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা এবং সেখানেই তার পরিবারের সদস্যরা থাকেন। সম্প্রতি বাড়ির জন্য একটি সোলার প্যানেল কিনেছেন তিনি। 

মারুফ মোরশেদ বলেন, “দিন দিন লোডশেডিং বাড়ছে। এই গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে আমার পরিবার কষ্টে পড়ে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিষয়টি আমি দেখছি। জ্বালানি সংকট আরও খারাপ হতে পারে। তাই আমি বাড়িতে বসানোর জন্য একটি সোলার প্যানেল সিস্টেম কিনেছি।” 

তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে গ্রামাঞ্চলে বয়স্ক সদস্য ও শিশুরা বেশি সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এই সমস্যা প্রকট আকারে দেখা দেয়।” 

গুলিস্তান ও স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় থাকা সৌর ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের দোকানগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ইলেকট্রনিকসের এসব দোকানের মালিকেরা বলছেন, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার এবং ব্যাটারিচালিত যন্ত্রপাতির চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। 

হৃদয় ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস দোকানের মালিক হৃদয় হোসেন বলেন, “সবশেষ কয়েক সপ্তাহে বিক্রি অনেক বেড়েছে। আগে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি কাস্টমারের জন্য। কিন্তু সবশেষ কয়েক দিনে সোলার লাইট ও ব্যাটারির চাহিদা চরম আকারে বেড়েছে।” 

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বর্তমানে চাহিদার তুঙ্গে রয়েছে ব্যাটারিচালিত ফ্যান, এলইডি লাইট, মোবাইল চার্জিং সিস্টেম এবং হাইব্রিড ইনভার্টার। 

বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্রেতা আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ কেনার পরিবর্তে সম্পূর্ণ সোলার প্যাকেজ কিনতেই বেশি আগ্রহী। 

বর্তমানে যেসব প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো হলো— 

৬৫ ওয়াটের প্যাকেজ: ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা; 

১০০ ওয়াটের প্যাকেজ: ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা; 

১০০ ওয়াটের সেটআপসহ সিলিং ফ্যান: ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা; 

১৫০ ওয়াটের প্যাকেজ: ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা; 

১৫০ ওয়াটের হাই-ক্যাপিসিটি প্যাকেজ: ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা; 

২০০ ওয়াটের প্যাকেজ: ৩৬ থেকে ৩৯ হাজার টাকা। 

এই প্যাকেজগুলোতে সাধারণত সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, চার্জ কন্ট্রোলার, এলইডি লাইট এবং ফ্যান অন্তর্ভুক্ত থাকে। 

আলতাফ হোসেন নামে আরেক কাস্টমার জানান, তিনি মার্কেটে এসেছেন নষ্ট হয়ে যাওয়া ব্যাটারি পাল্টাতে। তিনি বলেন, “মাসখানেক আগে থেকে আমার সোলারের ব্যাটারি কাজ করছে না। এর মধ্যে লোডশেডিং বাড়ছে। এর জন্য ব্যাটারি পাল্টাতে এসেছি।” 

ছোট আকারের সোলার সিস্টেমের পাশাপাশি একাধিক যন্ত্রপাতি চালাতে সক্ষম হাইব্রিড ইনভার্টার সিস্টেমের চাহিদাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। 

হাইব্রিডের জনপ্রিয় সিস্টেমগুলোর মধ্যে রয়েছে— 

১০০০ ভিএ হাইব্রিড ইনভার্টার সিস্টেম: প্রায় ৭৫ হাজার টাকা; 

১২০০ ভিএ হাইব্রিড ইনভার্টার সিস্টেম: প্রায় ৮০ হাজার টাকা। 

এই সোলার সিস্টেমগুলো একাধিক ফ্যান, লাইট, টেলিভিশন, রাউটার এবং মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট চালাতে সক্ষম। ফলে এগুলো শহর ও গ্রাম উভয় এলাকার পরিবারের জন্য উপযোগী। 

সোলার ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের বিক্রি যে শুধু ঢাকাতে বেড়েছে এমনটি নয়। জেলা শহরগুলোর খুচরা বিক্রেতারাও ব্যাটারিচালিত যন্ত্রপাতির চাহিদায় একই ধরনের বৃদ্ধি লক্ষ্য করছেন। লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের হাজিরহাটে স্মার্ট ইলেকট্রনিকসের মালিক নাইমুর রহমান বলেন, “সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যবসার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।” 

তিনি আরও বলেন, “বিদ্যুৎ সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের এলাকায় লোডশেডিং এখন নিয়মিত হয়ে গেছে। মানুষ এখন প্রায়ই ব্যাটারিচালিত ফ্যান ও লাইট সম্পর্কে জানতে চাইছে।” তিনি ঢাকার সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, যাতে ব্যাটারিচালিত টেলিভিশন, সোলারচালিত লাইট এবং বৈদ্যুতিক রান্নার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারেন। খুব শিগগিরই বাংলাদেশে এসব পণ্যের একটি বড় বাজার তৈরি হবে বলে বিশ্বাস নাইমুরের। 

সাতক্ষীরা বড় বাজারের ব্যবসায়ী সায়েম আলম বলেন, “উপকূলীয় জেলাগুলোতে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ভোক্তারা বিকল্প জ্বালানি পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। আমাদের এলাকায় লোডশেডিং খুবই ঘন ঘন হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ না থাকলে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে।” মোবাইল চার্জিং, লাইট ও টেলিভিশন চালানোর ক্ষেত্রেও এখন ব্যাটারিচালিত প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী। 

পিরোজপুরের উজিরপুরের বাসিন্দা রাহাত ইসলাম বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এখন পরিবারের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছি। আগামী মাসগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।” 

সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সোলার পণ্য আরও সাশ্রয়ী করতে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সোলার সিস্টেম যদি আরও সাশ্রয়ী হয়, তাহলে আরও বেশি মানুষ এটি কিনবে।” 

সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এসআরইডিএ) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “বর্তমান চাপের কারণে মানুষের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়েও মানুষের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি আগ্রহ থাকা উচিত ছিল।” 

তিনি আরও বলেন, “আমরা ২০২৫ সালে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করেছি এবং সেই কাঠামোর অধীনে বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।” 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সৌর শক্তিতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সৌর শক্তির সম্ভাবনা অনেক দেশের তুলনায় ভালো। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারি।” 

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জাকির হোসেন খান বলেন, “বর্তমান সংকট বিকল্প জ্বালানি উৎস সম্প্রসারণের জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছে। এই সংকট দেখিয়েছে, শুধু প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আর টেকসই নয়। ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সোলার ব্যবহারের বিস্তার ঘটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।” 

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, চলমান বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশের ভোক্তা আচরণকে পরিবর্তন করছে। যা একসময় বিলাসবহুল সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতো, তা এখন প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হচ্ছে। 

সৌর ও ব্যাটারিচালিত পণ্যের চাহিদার এই উল্লম্ফন দ্রুত সম্প্রসারিত একটি বিকল্প জ্বালানি বাজারের উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে— যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে— কার্যকর নীতি, আর্থিক প্রণোদনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সহায়তা পেলে বর্তমান সংকট শেষ পর্যন্ত দেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। 

/এবিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে দিতে হবে না বাড়তি দাম
বিদ্যুতের দাম কমাতে রিভিউ আবেদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
সর্বশেষ খবর
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী