লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ না থাকার মধ্যে পার্থক্য কী

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৮আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৮

গরম বাড়লেই কিংবা বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের কাছে সব ক্ষেত্রেই বিষয়টি একই—সুইচ চাপলেও বাতি জ্বলছে না, ফ্যান ঘুরছে না। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের ভাষায় সব বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্নতাকে ‘লোডশেডিং’ বলা হয় না। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ করা এক ধরনের ঘটনা; আবার বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন বা বিতরণব্যবস্থার ত্রুটি, দুর্ঘটনা কিংবা আবহাওয়াজনিত কারণে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া আরেক ধরনের ঘটনা।

লোডশেডিং কী?

সহজ ভাষায়, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হলে পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থাকে ভারসাম্যে রাখতে কোনো কোনো এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াই লোডশেডিং। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ‘লোডশেডিং’-কে সংজ্ঞায়িত করেছে—বিদ্যুৎব্যবস্থার কোনো অংশে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। সরবরাহের পরিমাণ চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত না হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে সিস্টেম অপারেটররা এটি করতে পারেন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যেও ‘চাহিদা’ ও ‘লোডশেডিং’ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়। তাদের দৈনিক তথ্যভান্ডারে কোনো অঞ্চলের চাহিদার বিপরীতে কত মেগাওয়াট ‘লোডশেড’ করা হয়েছে, তা দেখানো হয়। অর্থাৎ চাহিদা থাকলেও সেই মুহূর্তে পুরো চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না করে যে অংশটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেটিই লোডশেডিং হিসেবে হিসাব হয়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন বা সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে ৯০০ মেগাওয়াট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তখন ১০০ মেগাওয়াটের ঘাটতি সামাল দিতে কোনো কোনো ফিডার বা এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ করা হতে পারে। এটিই লোডশেডিং।

তাহলে ‘বিদ্যুৎ না থাকা’ বলতে কী বোঝায়?

‘বিদ্যুৎ না থাকা’ একটি সাধারণ বা ভোক্তাকেন্দ্রিক শব্দ। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া, সঞ্চালন লাইনে সমস্যা, ট্রান্সফরমার বা সাবস্টেশনে ত্রুটি, বিতরণ লাইনে দুর্ঘটনা, গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া, বজ্রপাত বা ঝড়—এসব কারণেও কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ না থাকার অর্থ শুধু লোডশেডিং নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের কারণ হিসেবে আবহাওয়া, গাছপালা এবং বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমসহ নানা বিষয় থাকতে পারে।

মূল পার্থক্য কোথায়?

দুটি বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, লোডশেডিং সাধারণত বিদ্যুৎব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে করা হয়; অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটি বা দুর্ঘটনার কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে সেটি সাধারণ বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা আউটেজ।

সহজ করে বলা যায়— চাহিদা বেশি, কিন্তু সরবরাহ কম; এই অবস্থা বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি করে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পরিকল্পিতভাবে কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ করা হলে সেটি লোডশেডিং।

আর লাইন, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্য কোনো যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াই বিদ্যুৎ বিভ্রাট।

তবে ভোক্তার দিক থেকে দুটির পার্থক্য সব সময় বোঝা সম্ভব নয়। আইইএ-ও বলছে, লোডশেডিং ভোক্তার কাছে বিতরণব্যবস্থার অন্য ধরনের বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্নতার মতোই মনে হতে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেই কি লোডশেডিং হয়

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সবসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেই লোডশেডিং হয় না। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নির্ভর করে শুধু মোট উৎপাদনের ওপর নয়; উৎপাদন কোথায় হচ্ছে, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা কতটুকু; এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি। তবুও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সঞ্চালন লাইন বা সাবস্টেশনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পৌঁছানো নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকার কারণ সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের উৎপাদন ঘাটতি নাও হতে পারে।

বিপিডিবির তথ্যেও অঞ্চলভেদে চাহিদা, সরবরাহ ও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আলাদাভাবে দেখানো হয়। ফলে দেশের কোথাও লোডশেডিং থাকলেও অন্য কোনো অঞ্চলে একই সময়ে তা নাও থাকতে পারে।

কেন লোডশেডিং করতে হয়

বিদ্যুৎব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই সময়ে উৎপাদন ও ব্যবহারকে প্রায় ভারসাম্যে রাখতে হয়। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে কিন্তু উৎপাদন বা আমদানি বাড়িয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হলে সিস্টেমের ওপর চাপ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে পুরো গ্রিডকে ঝুঁকিতে না ফেলে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। আইইএ বলছে, সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা থাকলে অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ার পর ‘লোডশেডিং’ সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষার একটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিপিডিবির দৈনিক প্রতিবেদনে ‘জেনারেশন শর্টফল’ এবং ‘লোডশেড’ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ উৎপাদন ঘাটতি থাকলে তার প্রভাবের একটি অংশ লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া হতে পারে।

বিদ্যুৎ না থাকার আরও কী কারণ থাকতে পারে

লোডশেডিং ছাড়াও কয়েকটি কারণে বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে—

১. বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি: কোনো ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন কমে যেতে পারে।
২. সঞ্চালন লাইনের সমস্যা: উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি হলে বড় এলাকার সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে।
৩. বিতরণ লাইনের ত্রুটি: স্থানীয় পর্যায়ে ফিডার, ট্রান্সফরমার বা বিতরণ লাইনে সমস্যা হলে নির্দিষ্ট এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হতে পারে।
৪. ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত: গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা বজ্রপাতের কারণে সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় আবহাওয়াজনিত ঘটনা বড় ধরনের বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণ হতে পারে বলে আইইএ-ও উল্লেখ করেছে।
৫. রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত: নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো লাইন বা যন্ত্রপাতি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলেও কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন এটি লোডশেডিং, নাকি অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ নেই

সাধারণ ভোক্তার পক্ষে সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা কঠিন। তবে কয়েকটি লক্ষণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

যদি বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট সময় পরপর কোনো এলাকার নির্দিষ্ট অংশে বন্ধ হয় এবং পরে আবার আসে, সেটি লোডশেডিংয়ের অংশ হতে পারে। বিপরীতে কোনো এলাকায় হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে দীর্ঘ সময়েও না এলে এবং আশপাশের এলাকাতেও একই সমস্যা দেখা দিলে সেটি কোনো কারিগরি ত্রুটি বা বড় ধরনের বিভ্রাটের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী সংস্থার তথ্য বা অভিযোগ কেন্দ্র থেকে কারণ জানা। কারণ একই সময়ে একটি এলাকায় লোডশেডিং এবং অন্য এলাকায় কারিগরি ত্রুটিজনিত বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্নতা; দুই ঘটনাই ঘটতে পারে।

এক কথায় বলতে গেলে, লোডশেডিং হলো বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ করা। আর ‘বিদ্যুৎ না থাকা’ হলো একটি সাধারণ অবস্থা—যার কারণ লোডশেডিং ছাড়াও যান্ত্রিক ত্রুটি, সঞ্চালন বা বিতরণ লাইনের সমস্যা, দুর্ঘটনা, আবহাওয়া কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ হতে পারে।

তাই প্রতিবার বিদ্যুৎ চলে গেলেই সেটিকে ‘লোডশেডিং’ বলা কারিগরি দিক থেকে সঠিক নয়। বিদ্যুৎ খাতের হিসাবে ‘লোডশেড’ এবং ‘আউটেজ’ বা বিদ্যুৎ-বিভ্রাট দুটি আলাদা বিষয়।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, আইইএ, ইআইএ

/ইউএস/
সম্পর্কিত
অবৈধ অটোরিকশায় বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা: মন্ত্রী
‘গ্যাস নিতেই দিন শেষ, ভাড়া মারবো কখন’ 
জরুরি এলএনজি আমদানিসহ ৪ প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন
সর্বশেষ খবর
মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প
মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প
হাসপাতালে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশি চিকিৎসককে খুঁজছে এফবিআই
হাসপাতালে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশি চিকিৎসককে খুঁজছে এফবিআই
মিডফোর্ডে সোহাগ হত্যা মামলায় আরও তিন জনের সাক্ষ্য
মিডফোর্ডে সোহাগ হত্যা মামলায় আরও তিন জনের সাক্ষ্য
মৃত্যুদণ্ড হয়েছে রমজানের, জেল খাটছেন নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া
মৃত্যুদণ্ড হয়েছে রমজানের, জেল খাটছেন নিরপরাধ দিনমজুর সোনা মিয়া
সর্বাধিক পঠিত
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
শাহজালালে দুই যাত্রীর লাগেজে মিললো ৩ লাখ টাকার বিদেশি মদ
শাহজালালে দুই যাত্রীর লাগেজে মিললো ৩ লাখ টাকার বিদেশি মদ
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেই পুড়ে গেলো ৩ মহল্লার টিভি-ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য
বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেই পুড়ে গেলো ৩ মহল্লার টিভি-ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য
সব চূড়ান্ত, এখন অপেক্ষা ইধিকা পালের
সব চূড়ান্ত, এখন অপেক্ষা ইধিকা পালের