রাজধানীর রান্নাঘরে এখন আর গ্যাসের গন্ধ নেই, আছে শুধু অপেক্ষা আর দীর্ঘশ্বাস। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় এক ফোঁটা নীল আগুনের জন্য অপেক্ষা করছে লাখো পরিবার। লাইনের গ্যাসে স্বল্পচাপ, পাইপলাইন মেরামতের অজুহাত আর বাজারে এলপিজির চড়া দাম— এই ত্রিমুখী চাপে ঢাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্তের হাঁড়ি এখন অচল।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ ও পুরান ঢাকা— কোথাও চিত্র ভিন্ন নয়। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত চুলা একেবারেই নিভু নিভু করে। কোথাও টিমটিম করে জ্বললেও তাতে এক কড়াই তেল গরম করাও দায়।
‘রান্নার নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই’
বাড্ডার বাসিন্দা গৃহিণী কানিজ আক্তার জানালেন, এক অসহায় বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘‘রান্নার নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। গ্যাস এলে তখনই হাঁড়ি বসাতে হয়। মাঝরাতে রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিচ্ছি। পরিবার নিয়ে এভাবে চলা খুব কষ্টকর।’’
একই এলাকার মার্জিয়া আক্তারের কণ্ঠে আরও তীব্র হতাশা। ‘‘দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময় মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।’’
রামপুরার মোর্শেদা সেতু বলেন, ‘‘সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে, কোনও রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে।’’
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে কর্মজীবী ও শিশুরা
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে কর্মজীবী পরিবার। সকালে রান্না করতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেল বা রাস্তার দোকানের অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
রামপুরার বাসিন্দা জুয়েল মুস্তাফিজ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘‘গ্যাস না থাকলেও মাস শেষে বিল ঠিকই আসে। রান্না করতে না পেরে বাইরে খেতে হচ্ছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’’
শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে পরিবারগুলো পড়েছে চরম উৎকণ্ঠায়। সময় মতো শিশুর খাবার তৈরি করতে না পারার যন্ত্রণা যে কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী মায়েরাই জানেন।
এলপিজিতেও স্বস্তি নেই, উল্টো গলাকাটা দাম
লাইনের গ্যাস না পেয়ে অনেকেই এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সেখানেও মিলছে না স্বস্তি। বাজারে সরবরাহ কম, আর দাম আকাশছোঁয়া।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘‘সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে দোকানদার গ্যাসই দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।’’
ফলে কেউ কিনছেন ইন্ডাকশন কুকার, কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা, আর নিম্ন আয়ের মানুষ ফিরে যাচ্ছেন মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নায়। রাজধানীর বুকেই যেন এক মধ্যযুগীয় চিত্র।
ঢাকাবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন— এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? রান্নাঘরের চুলাটা কবে আবার স্বাভাবিকভাবে জ্বলবে? স্থায়ী একটা সমাধানের দাবি জানান তারা।

গ্যাস সংকটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা, অর্থনীতিতে ক্ষতি কত?






