সেকশনস

কবির জন্য স্বীকৃতি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৪:৩৩

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিকামী বাংলাদেশের নারীদের সম্মান নষ্ট করে এদেশকে একটি সম্ভ্রম-লুণ্ঠিত সমাজ উপহার দিতে চেয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতাকে হত্যার পর দেশের প্রধান অর্জনগুলো ধ্বংসের সকল আয়োজন বাস্তবায়ন শুরু হয়। সে গ্লানি থেকে নিজেদের গৌরব ও অমরত্ব অর্জনের এক মহিমাময় কাব্য রচনা করেছিলেন ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ২১ বছর বয়সী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, লিখেছিলেন, ‘ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা…’

আজ ১৬ অক্টোবর এই অকাল প্রয়াত কবির জন্মদিন। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আজ আমাদের কালের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়া এই তরুণ কবির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাচ্ছি যিনি আমাদের নারীর সম্মান আর জাতির পতাকাকে মূর্ত করেছিলেন একটি অমর কাব্য-প্রতীকের মাধ্যমে।

যারা ‘৭১ সালে যুদ্ধরত বাঙালি সমাজের নারীদের সম্মানহানী করেছে তাদের বংশধরেরা এখনও সেই একই কাজ করছে যাদের এই দেশের স্বাধীনতা, এই দেশের নারীর সম্মান আর এই দেশের অর্জনের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান নেই কারণ এরা পাকিস্তানী বর্বর সৈন্য ও তাদের দোসরদের একই চেতনায় বিশ্বাসী। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর কিশোর বয়স থেকেই এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন যার প্রমাণ তাঁর কবিতা আর গানের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। আমরা এখন এই কবিকে নিয়ে আর তেমন আলোচনা করি না। যদিও বাঙালি বিস্মৃতমুখি জাতি নয় বরঞ্চ ইতিহাসমুখি, অন্তত শেখ হাসিনার এই দেশে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে কার কী অবদান আর এই দেশটাকে ব্যর্থ করে রাখার ষড়যন্ত্রে কারা লিপ্ত তাঁর ইতিহাসও সুরক্ষিত লিপিবদ্ধ থাকছে, ফলে আমরা বিশেষ চিন্তিত নই তবে সময়ের কাজ সময়ে হলেই ভালো।

যে কাজটা আমাদের হয়নি তা হলো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে অধ্যয়ন। যদি এই কাজ আমরা ঠিকঠাক মতো করতে পারি তাহলে জানতে পারবো ’৭৫ পরের দেশটা কেমন ছিল আর সে পরিস্থিতি একজন ধীরস্থির কিন্তু প্রতিবাদী তরুণ কবিকে কেমন করে নাড়া দিয়েছিল। আর সে অধ্যয়নের দায়িত্ব এখন তরুণ সমজের ওপরেই বর্তায়। আমরা যারা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র সমসাময়িক, বন্ধু বা সতীর্থ বা সহযোগী হিসেবে যেমন পেয়েছি সেসবের মধ্যে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় এ কথা স্বীকার করতে অন্তত আমার কোনও দ্বিধা নেই। ফলে আমাদের বন্ধুদের অসুবিধা হলো রুদ্রের জন্যে আমাদের অতিমাত্রার আবেগ যা বন্ধুপক্ষের চক্র থেকে আমাদের বেরুতে দেয় না। কিন্তু সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মাত্র কুড়ি বছরের সাহিত্য সাধনায় বাংলাদেশকে একটি মানবিক দেশ গঠনের সংগ্রাম চালিয়েছেন আর তা বুঝতে আমাদের কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবেই। যেমন, রুদ্রের কবিতায় অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও অমূল্য করে ধরে রাখতে সংগ্রামের চিত্র আছে যেসবের ’৭৫ পরের এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে, সেসবের কাব্য রূপকার ছিলেন রুদ্র “জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরনো শকুন”; আমাদের বুঝতে হবে এই ছত্রে একটি দেশের ইতিহাসকে উল্টোরথে পরিচালিত করার বিরুদ্ধে ২১ বছর বয়সে এই কবি কেমন করে কলম ধরেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের ভেবে দরকার ’৭৫ পরের কালে যতগুলো প্রতিবাদ ও সাংগঠনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রায় সবগুলো আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন এই রুদ্র, সমসাময়িক কবি ও বন্ধুদের নিয়ে গঠিত ‘রাখাল’ ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’, ‘বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়ন’, ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ সকল ক্ষেত্রে রুদ্রের ছিল সরব উপস্থিতি ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব-নৈপুণের স্বাক্ষর।

তৃতীয়ত, আমাদের জানা ও অন্বেষণ করা দরকার রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর কাব্য-দর্শনে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধারণ করে তাঁর রচনায় শহুরে নাগরিক জীবনকে পুনর্বিন্যাস করেছেন যার সাহিত্যমূল্য অসীম। তাঁর রচিত গান দ্রুত বাঙালি সমাজে জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ সাধারণের জীবনের সুখদুঃখকে উপজীব্য করার এক অসাধারণ ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা তাঁকে দিয়েছিলেন।

আমরা জানি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে ঠাঁই পেয়েছেন কিন্তু তাঁর সৃজনশীল ক্ষমতা অনাবিষ্কৃত রেখে ও অন্বেষণ ছাড়া কেবলমাত্র স্মরণ-আয়োজনের মধ্যে তাঁকে সীমিত না রেখে আমাদের উচিত হবে একটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এই কবিকে দেবার ব্যবস্থা করা। বেঁচে থাকলে রুদ্র কখনও কোনো পুরস্কার বা পদকের ধার ধারতেন না একথা আমি হলফ করে বলতে পারি, কিন্তু আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও ’৭৫ পরবর্তী সমাজ-দর্শনের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক স্থাপনে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ঐতিহাসিক কারণেই দিতে হবে, না হলে সমাজ-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের একটি মূল্যবান দিক অনুন্মোচিত ও ভুল থেকে যাবে।

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র সতীর্থ)

//জেডএস//

সম্পর্কিত

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

বিদায় নক্ষত্রের আলো রাবেয়া খাতুন

বিদায় নক্ষত্রের আলো রাবেয়া খাতুন

২০২১ আরও দিশাহীন করে তুলতে পারে

২০২১ আরও দিশাহীন করে তুলতে পারে

কিম কি দুক : কোরিয়ান নিউ ওয়েভের যাযাবর

কিম কি দুক : কোরিয়ান নিউ ওয়েভের যাযাবর

সময় ও জীবনের সংবেদী রূপকার

সময় ও জীবনের সংবেদী রূপকার

প্রসঙ্গ সৈয়দ হকের কাব্যনাট্য

প্রসঙ্গ সৈয়দ হকের কাব্যনাট্য

যিশুর জন্মদিনেই আড়ালে চলে যান 'কলকাতার যিশু'র কবি

যিশুর জন্মদিনেই আড়ালে চলে যান 'কলকাতার যিশু'র কবি

অথবা আকাশই শুধু থেকে যায়...

অথবা আকাশই শুধু থেকে যায়...

সর্বশেষ

থমকে আছি

থমকে আছি

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

সম্পর্ক; আপন-পর

সম্পর্ক; আপন-পর

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

লুইস গ্লুকের নোবেল ভাষণ

লুইস গ্লুকের নোবেল ভাষণ

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৫

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৫

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.