নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সারাদেশে রমজান মাসে পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতায় তাদের কার্যক্রমে সাড়া দিচ্ছেন না কুষ্টিয়ার ডিলাররা। একারণে কুষ্টিয়ায় টিসিবি’র কার্যক্রম একেবারে নেই বললেই চলে। কম বরাদ্দ, পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচ এবং পণ্যের মান খারাপ হওয়ায় ও পরিমাণে কম দেওয়ায় টিসিবির পণ্য তুলতে আগ্রহ পাচ্ছেন না তারা। এদিকে, স্বল্প দামে পণ্য কিনতে না পেরে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলাগুলোতে চাহিদার তুলনায় খুবই অল্প পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করে টিসিবি। আর সেসব পণ্য আনতে হয় বিভাগীয় শহরগুলো থেকে। এ কারণে জেলার টিসিবি ডিলারদের মধ্যে এসব পণ্য উত্তোলনে আগ্রহ কম। একই কারণে খুলনা থেকে স্বল্প পরিমাণ পণ্য উত্তোলনে আগ্রহ দেখাননি কুষ্টিয়ার ডিলাররা।
তাদের দাবি, টিসিবি একটি অক্ষম প্রতিষ্ঠান। সুযোগ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বাজারে কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই এর জন্য দায়ী। এই রমজান মাসেও টিসিবি যেসব পণ্য সরবরাহ করছে সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের। গতবার অভিযোগ ছিল বলে এবার খেজুর দেওয়া হয়নি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে ভীষণ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এবার খোঁড়া অজুহাতে ভোজ্য তেল দেওয়া হয়নি। তাই স্থবির ও অকার্যকর এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, লোকসান দিয়ে তো আর কেউ সরকারের পচা মাল জনগণের কাছে বেচতে যাবে না।
তারা আরও অভিযোগ করেছেন, ডিপো থেকে পণ্য ওঠানোর সময় এর কর্মচারীরা ইচ্ছা করেই ওজনে ঘাপলা করে কম দেয়, জেলায় পণ্যের যতটুকু চাহিদা ততটুকু সরবরাহও করা হয় না। এছাড়াও বাজার অনুযায়ী পণ্যের দাম বেশি ও মান খারাপ। তাই এসব পণ্য তোলার ব্যাপারে আগ্রহ নেই তাদের।
কয়েকজন ডিলার বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বিগত সময়ে প্রত্যক ডিলারের জন্য ১ টন চিনি, ১০০ কেজি মসুর ডাল, ২০০ কেজি নেপালি ডাল, ৬০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৪০০ কেজি ছোলা ও ১০০ কেজি খেজুর বরাদ্দ থাকতো। কিন্তু, এ বছর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০০ কেজি চিনি, ২০০ কেজি মসুর ডাল ও ৫০০ কেজি ছোলা। এর মধ্যে ছোলা ও মসুর ডালের বরাদ্দ বেশি হলেও বরাদ্দ নেই সয়াবিন তেল ও রমজানের অন্যতম চাহিদা সম্পন্ন ফল খেজুরের। তাদের দাবি পণ্য ওঠাতে গিয়ে দেখা গেছে, টিসিবি যেসব পণ্য সরবরাহ করছে সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের।
সূত্র মতে, কুষ্টিয়ার ৬ উপজেলায় ৩২ জন ডিলারের মধ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ডিলার ১৪ জন। এর মধ্যে পৌরসভা ও শহরেই ১২ জন। এছাড়া কুমারখালী উপজেলায় ২, খোকসা উপজেলায় ৩, দৌলতপুরে ২, ভেড়ামারায় ৩ ও মিরপুর উপজেলায় ৮ জন ডিলার রয়েছেন। তবে এ বছর শুধুমাত্র একজন ব্যবসায়ী টিসিবি’র পণ্য উত্তোলন করেছেন।
কুষ্টিয়া বড় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও একমাত্র টিসিবির পণ্য উত্তোলনকারী ডিলার মোকাররম হোসেন মোয়াজ্জেম বলেন, কুষ্টিয়া থেকে টিসিবির পণ্য ওঠাতে আমাদের খুলনা আসতে হয়। এখানে এসে পেয়েছি মাত্র ৪০০ কেজি চিনি, ২০০ কেজি মসুর ডাল ও ৫০০ কেজি ছোলা। এ বছর সয়াবিন তেল ও খেজুর বরাদ্দ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। এইটুকু মাল আনতে আমাকে একটি ট্রাক ভাড়া করতে হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে। এত ঝামেলা করে অল্প পরিমাণ পণ্য নিয়ে লাভ কী? আর এইটুকু মাল কাকে দেবো?।
তিনি আরও বলেন, রোজার মাসে পণ্য বিক্রিতে ডিলারদের তেমন একটা লাভ নেই। এরপরও টিসিবির আগ্রহে বিক্রি করা হলেও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের কারণে প্রায়ই আমাদের লোকসান দিতে হচ্ছে। তার দাবি, টিসিবির উচিত অন্তত রোজার মাসকে সামনে রেখে ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করা।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার উজানগ্রাম এলাকার টিসিবি ডিলার গোলাম মোস্তফা ফরহাদ জানান, টিসিবি পণ্য খুলনা থেকে আনার পর বিক্রি করতে হয়। টিসিবি পণ্য নিম্নমানের, সব পণ্য না দেওয়া, খোলা বাজার ও টিসিবি পণ্যের দাম অনেকটাই এক হওয়ায় পরিবহন খরচ নিজের পকেট থেকে যায়। সে কারণে এবার টিসিবির পণ্য আনা হয়নি।
সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুরের টিসিবি ডিলার জাহিদুল ইসলাম ডাবলু বলেন, টিসিবির পণ্য বিক্রি করে কোনও লাভ হয় না। পণ্যের গুণগতমান খুব ভালো না। ছোলার দাম কম থাকায় চাহিদা থাকা সত্বেও কর্তৃপক্ষ ছোলা দেয় না। চিনির অবস্থা জঘন্য। ওজনেও দেওয়া হয় কম। তাই পণ্য উত্তোলন করা হয়নি।
এদিকে, বিক্রেতাদের নানা অভিযোগ ও অজুহাত থাকলেও ক্রেতাদের কাছে এখনও বিপুল চাহিদা রয়েছে টিসিবির পণ্যের। সাধারণ ক্রেতারা টিসিবি’র ডিলারদের দোকানে এসে পণ্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কুষ্টিয়া আড়ুয়াপাড়ার মানিক মণ্ডল বলেন, যেহেতু রমজান মাসে পণ্যের দাম বেশি হয়, সেক্ষেত্রে টিসিবি পণ্য বিক্রি চালু থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের উপকার হয়। রমজানে টিসিবি পণ্যের চাহিদা থাকায় ক্রেতারা বলছেন, টিসিবি পণ্য বিক্রি চালুর মধ্য দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। রমজানেই টিসিবি’র পণ্য বিক্রি চালু হোক।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের বিষয়ে ডিলার ও ক্রেতাদের অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। তবে তারা যতটা অভিযোগ করেছেন সবটুকু সঠিক নয়। কিছু কিছু জায়গায় সমস্যা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবি রমজানের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরাসরি জনগণের কাছে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি। এরই মধ্যে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডিসি কোর্ট চত্বরে পাইকারি মূল্যে খুচরা পর্যায়ে চিনি বিক্রি শুরু হয়েছে। গুণগত পণ্য সরবরাহ ও বিক্রি করে বাজার দর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সরকারের এই উদ্যোগ কার্যকর হবে।
এ বিষয়ে টিসিবি খুলনা অফিসের অফিস ইনচার্জ রবিউল মোর্শেদ বলেন, এ বছর রমজান উপলক্ষে চিনি, মসুর ডাল, ছোলা ও তেল সরবরাহ করছি। এর মধ্যে ভোজ্য তেল হিসেবে পুষ্টি সরবরাহ করা হচ্ছে। হঠাৎ করে পুষ্টির কারখানা বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। কারখানা চালু হলে আবার দেওয়া হবে।
/এআর/টিএন/
আরও পড়তে পারেন : অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খুবির প্রশাসনিক কর্মকর্তা কারাগারে








