কুষ্টিয়ার ১০ স্টেশনের সিগনাল দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকায় ট্রেন ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা। গত আড়াই বছরে শুধু ট্রেনে কাটা পড়ে ১৯ জন মারা গেছে। এরমধ্যে চলতি বছরে ৮ জন, ২০১৫ সালে ৬ জন এবং ২০১৪ সালে ৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ চলতি বছরের গত ৯ জুন কুষ্টিয়ার পোড়াদহ এলাকার দূর্গাপুর ভারল রেলক্রসিং এর ১৭৪/০২ পিলারের কাছে রাজশাহী থেকে গোয়ালন্দগামী মধুমতি ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত (৫৫) এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ২৪ মে কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে কইর উদ্দিন সরদার (৬০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। মিরপুর পৌর রেলক্রসিং সংলগ্ন এই ঘটনা ঘটে। গত ২৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় ট্রেনের ধাক্কায় জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন কিশোর (২৭) নিহত হয়। গত ১১ এপ্রিল সোমবার সকাল ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে জলি (২২) নামে এক কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। জলি সকালে রেললাইন পার হওয়ার সময় মোবাইলে কথা বলছিল। এসময় রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী কপোতাক্ষ ট্রেনের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। গত ১৮ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার খোকসায় ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে অজ্ঞাত (২৬) এক যুবক আত্মহত্যা করে। তিনি খোকসা রেল স্টেশনের পূর্ব দিকের পদ্মবিলা গ্রামের মধ্যে পোড়াদহগামী সাটল ট্রেনের নিচে ঝাপ দেয়। গত ২৬ মার্চ শুক্রবার রাতে কুষ্টিয়ায় ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে অজ্ঞাত (২৫) এক যুবক আত্মহত্যা করে। পৌড়াদহ রেল স্টেশনের উত্তর দিকে স্টেশন থেকে মাত্র ২শ’ গজ দূরে এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনে কাটা পরে সোহেল রানা (২৪) এবং জাবেদ আলী (৩২) নামে দুই শ্রমিক নিহত হয়। মিরপুর স্টেশনের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওইদিন দুপুরে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা অভিমুখী চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেনটি মিরপুর স্টেশনের কাছে সোহেল রানা ও জাবেদ আলীকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই সোহেল রানা মারা যান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাবেদ নামে আরও এক শ্রমিক মারা যান। এদিকে ২০১৫ সালের কুষ্টিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে ৬ জনের মৃত্যু হয়। এরমধ্যে গত ২ নভেম্বর কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে আজমুল হোসেন (২০) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত ২৬ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা শহরের দক্ষিণ রেলগেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত (৪৫) এক ব্যক্তি নিহত হয়। গত ১৯ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত (৪৫) এক নারীর মৃত্যু হয়। গত ২৬ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা শহরের দক্ষিণ রেল গেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত (৪৫) এক ব্যক্তি নিহত হয়। গত ২ মার্চ কুষ্টিয়ার মিরপুরে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে শান্তি সাহা (৭২) নামের এক বৃদ্ধা আত্মহত্যা করে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার জগতি ইউনিয়নে ট্রেনে কাটা পড়ে পিন্টু হোসেন (১৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। কুষ্টিয়া-পোড়াদহ ট্রেন লাইনের জগতি কলাবাড়িয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। অপরদিকে ২০১৪ সালের কুষ্টিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়। গত ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার মিরপুরে ট্রেনের ধাক্কায় অজ্ঞাত (৪৫)এক নারীর মৃত্যু হয়। গত ৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ট্রেনে কাটা পড়ে তন্ময় (২০) নামের ১ যুবক নিহত হয়। গত ৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার পোড়াদহে ট্রেনে কাটা পড়ে সুমাইয়া খাতুন (২০) নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়। নিহত সুমাইয়া পোড়াদহ ইউনিয়নের চিথলিয়া এলাকার মিজানুর রহমানের স্ত্রী। গত ১২ মে কুষ্টিয়ার খোকসায় ট্রেনে কাটা পড়ে শান্টু শেখ (২৫) নামে এক ভ্যানচালক নিহত হয়।গত ১২ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত পরিচয় (৪৫) এক ব্যক্তি নিহত হয়।
টেলিকমিউনিকেশন কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এসব স্টেশনের সিগনাল কেবিন ও এর যন্ত্রাংশগুলো অত্যন্ত জরাজীর্ণ। সিগনাল কেবিন তৈরির সময় যেসব গিয়ার, হুইল, তার, পাত, এংগেল, রডসহ যন্ত্রাংশ বিভিন্ন পয়েন্টে লাগানো হয়েছিল, সেগুলো আজও পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে যন্ত্রাংশগুলো ক্ষয়ে অনেকটা অকেজো হয়ে গেছে।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা স্টেশন মাস্টার রুস্তম আলী জানান, জেলার কিছু রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাইনে সিগনাল-ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে রেলস্টেশনে এসে দাঁড়ালে চালকের হাতে অপারেশন পেপার টিকিট দিয়ে ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে সংকেত ও টেলিকমিউনিকেশনের প্রধান বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে লাইনে বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। চোরেরা প্রায়ই সিগনালের তার, রড,অ্যাঙ্গেলসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া এই লাইনে সিগনাল-ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর যন্ত্রপাতি ক্ষয়ে গেছে।
কুষ্টিয়ার পোড়াদহ জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শ্রী সুনীল কুমার ঘোষ জানায়, কুষ্টিয়ার ১০টি স্টেশনের মোট ৪২.৫ কিলমিটার রেলপথ রয়েছে। এসব রেলপথে মানুষের নিরাপত্তা দিতে লোক বলের প্রয়োজন। লোক বল বাড়াতে বেশ কয়েকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
/জেবি/টিএন/
আরও পড়ুন:







