স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ায় আমাকে গাছে বেঁধে পিটিয়েছিল ওরা। মারধরের কারণে আজও আমার কোমরে, পেটে, হাতে ও বাম পায়ের হাঁটুতে যন্ত্রণা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা এখনও সারেনি। আজও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারিনি। এখনও আমি নিয়মিত ওষুধ সেবন করছি— কথাগুলো বলছিলেন নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ডিগ্রি পাস কোর্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ববিতা খানম।
২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল সকাল ৭টায় স্বামীর বাড়িতে এসে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও তাদের ভাড়াটে মাস্তান প্রকৃতির লোকজন মিলে মধ্যযুগীয় কায়দায় গাছে বেঁধে ববিতাকে অমানবিক নির্যাতন করে।
ববিতা লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের এড়েন্দা গ্রামের ইসমাইল হোসেন মোল্যার মেয়ে।
ববিতা জানান, নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের শালবরাত গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে এ পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। আর এ ঘটনার পর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০১৫ সালের ৫ মে’র ওই ঘটনায় তার মা খাদিজা বেগম বাদী হয়ে আসামিদের নাম উল্লেখ করে লোহাগড়া থানায় মামলা দায়ের করেন।
ববিতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর উপজেলার একই ইউনিয়নের শালবরাত গ্রামের ছালাম শেখের ছেলে (সেনাসদস্য, মামলা হওয়ার পরে চাকুরিচ্যুত) শফিকুল শেখের সঙ্গে প্রণয়ের সূত্র ধরে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর শফিকুল ও শ্বশুর ছালাম শেখসহ পরিবারের সদস্যরা যৌতুক হিসেবে তার পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। এই যৌতুকের টাকা দিতে অপারগতা জানালে শফিকুল ও তাদের বাড়ির লোকজন তাকে স্ত্রী হিসেবে ঘরে তুলে নিতে নানা টালবাহানা শুরু করেন। এক পর্যায়ে শফিকুল ববিতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ববিতার সঙ্গে শফিকুল যোগাযোগও বন্ধ করে দেন।
ববিতার মা খাদিজা বেগম জানান, ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল ববিতার স্বামী শফিকুল শেখ কর্মস্থল সিলেট থেকে বাড়িতে এসে এড়েন্দাস্থ তাদের বাড়ি থেকে ববিতাকে নিজ বাড়ি শালবরাত গ্রামে নিয়ে আসেন। পরদিন (৩০ এপ্রিল) সকাল সোয়া ৭টার দিকে ববিতার স্বামী শফিকুল, শফিকুলের বড় ভাই হাসান শেখ, শ্বশুর ছালাম শেখ, শাশুড়ি জিরিন আক্তার, চাচা শ্বশুর কালাম শেখ, প্রতিবেশী নান্নু শেখ ও পদ্মবিলা গ্রামের আজিজুর রহমান আরজু ববিতাকে মেহগনি গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেধড়ক লাঠিপেটা করেন। লাঠির আঘাতে ববিতার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
গৃহবধূ ববিতাকে নির্যাতনের এ খবর সেই সময়কার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ২০১৫ সালের ১০ মে হাইকোর্ট সুয়ামোটো জারি করে এ ঘটনায় জড়িতদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ববিতার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর মামলায় পরবর্তীতে আটজনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা লোহাগড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম।
এসআই নজরুল ইসলাম জানান, মামলায় সাতজনকে আসামি করা হলেও আরও একজনকে অভিযুক্ত করে মোট আটজনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। আসামিরা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ববিতার মা খাদিজা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসামিরা জামিন পাওয়ার পর থেকে মামলা তুলে নিতে আমাদের নানাভাবে চাপ দিচ্ছে।আমাদের পরিবারের বাইরের দু’জন সাক্ষী মামলার পক্ষে সাক্ষী দেওয়ায় তাদের ওপর গত বছরের ১৭ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হামলা করা হয়েছে। সর্বশেষ ২ জানুয়ারি রাতে আমাদের বাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় আসামিরা।এ ঘটনায় থানায় মামলা দিতে গেলে থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। দু’বার এজাহার দায়েরের পর শেষ পর্যন্ত ১৫ জানুয়ারি মামলা রুজু হয়েছে।
এ মামলার ব্যাপারে লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ঘরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা মামলায় আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ববিতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য নিয়মিত পুলিশ টহল দিচ্ছে।
তবে ববিতার অভিযোগ এ মামলা নিতে ওসি জাহাঙ্গীর প্রথমে টালবাহানা করেন। পরে মামলা নিলেও আসামিদের গ্রেফতার করার ব্যাপারে তিনি কোনও উদ্যোগ নিচ্ছেন না। আসামিরা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাকে দেখলেই নানা ধরনের শাসানি ও দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ইভ টিজিংও করছে।
এদিকে, ববিতার স্বামী হিসেবে অভিযুক্ত শফিকুল বলেন, ‘মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে অথচ আমি ঘটনার সময় বাড়িতেই ছিলাম না। ওই সময় আমি আমার কর্মস্থল সিলেটে ছিলাম। আর ববিতা আমার স্ত্রী নয়। সে আমাকে স্বামী হিসেবে পেতে ভিন্ন জেলা যশোরের অভয়নগর থেকে একটি ভুয়া কাবিন এবং আমার বাড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার থেকে দূরে নড়াইল সদর উপজেলার মাঝপাড়া থেকে আরেকটি ভুয়া কাবিন তৈরি করে মিথ্যাভাবে আমাকে ফাঁসিয়েছে। তার এসব কাবিনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কাশিপুর ইউপির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান ও মাইজপাড়ার নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে যে তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে, সেটিতেও কাবিন ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলার রাজপাট ইউনিয়নের নাট গ্রামের মিজানুর রহমানের মেয়ে মাহমুদা আক্তার আমার বৈধ স্ত্রী।আমাদের ঘরে দু’বছরের একটি শিশু সন্তান রয়েছে।’
মামলার অপর আসামি আজিজুর রহমান আরজু জানান, ববিতাকে গাছে বেঁধে মারধরের ঘটনার মামলায় আমাকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নড়াইল দায়রা জজ কোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘এ মামলায় ভিকটিম ববিতার সাক্ষী চলছে। মামলার বাদীসহ অন্য দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।’
এদিকে দীর্ঘ দুই বছর ধরে মামলা টানতে গিয়ে পারিবারিক স্বচ্ছলতা হারিয়ে ফেলেছেন ববিতারা। তাই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে একটা চাকরির ভীষণ প্রয়োজন বোধ করছেন তিনি। ববিতা বলেন, ‘স্বাভাবিক এবং স্বচ্ছল জীবনে ফিরে যেতে আমার একটা চাকরির প্রয়োজন। যদি কোনও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমাকে চাকরির সুযোগ করে দেয় তাহলে আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।’
আমার মতো আর কেউ যেন এমন নির্যাতনের শিকার না হয় সে জন্যেও ভবিষতে কাজও করবেন বলেও জানিয়েছেন ববিতা।
/এমডিপি/টিএন/








