কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডিপথেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাস খানেক আগে ১০৮ জন ডিপথেরিয়া আক্রান্ত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ শনাক্ত করা হয়। এ সংখ্যা বর্তমানে ৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শিশুসহ ৩০ জন রোহিঙ্গা মারা গেছেন।
টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, কেবল ডিপথেরিয়া নয়, ঠাণ্ডাজনিত নানান রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হচ্ছে।
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৫নং মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছেন ফাতেমা বেগম (৩০) নামের এক রোহিঙ্গা নারী। তিনি জানান, তার ছেলে শফিউল আলম (৫) এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ। কিছুতেই তার জ্বর কমছে না। একইসঙ্গে সর্দি-কাশিও লেগে আছে। অনেকবার ডাক্তার দেখিয়েছেন। ওষুধ নিতে আবারও ডাক্তারের কাছে এসেছেন।
সাহেরা খাতুন (৫৫) নামের অন্য এক রোহিঙ্গা নারী জানান, দুই দিন আগে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। ওই সময় প্রচণ্ড বাতাসে তার ঘরের ছাউনি উড়ে গেছে। রাতভর শীতে ভুগেছেন। তার আশপাশের অনেকেই শীতের কম্বল পেয়েছেন। আবার অনেকে বেশি পেয়ে অন্যের কাছে বিক্রিও করে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি শীতের কোনও কম্বল পাননি। তাই শীতে সর্দি-কাশিতে ভুগছেন।
আবু সৈয়দ নামের এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, ‘শুনেছি, ডিপথেরিয়া রোগে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছে। জানি না, এই রোগ হলে কী হয়। আমি আজ দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ। আমারও এই রোগ হয়েছে কিনা, আতঙ্কে আছি। ক্যাম্পের ডাক্তার ছাড়াও কক্সবাজার শহরে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু এখনও রোগ কমছে না।’
শুধু ফাতেমা, সাহেরা ও আবু সৈয়দ নয়; তাদের মতো হাজারো রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ঠাণ্ডাজনিত সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। অসুস্থ অনেকে আবার জানেন না, তারা ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন কিনা। এদিকে, রোহিঙ্গারা নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় ক্যাম্পের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ভিড় বেড়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দিন দিন ডিপথেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে জানিয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, ‘এপর্যন্ত দুই হাজার ৭শ’ রোহিঙ্গা শিশু-নারী-পুরুষ ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে শিশুসহ ২৭ জন মারা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই রোগে নতুন করে যাতে কোনও রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দা আক্রান্ত না হতে পারে, সেজন্য ইতোমধ্যে দুই লাখ ৫০ হাজার ৬০৭ জন রোহিঙ্গাকে টিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১ জানুয়ারি ৩০ হাজার স্থানীয়কে টিকা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর ও পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদেরও এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। আরও ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীদের ডিপথেরিয়ার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।’
নিকারুজ্জামান জানান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি ক্যাম্পে অনেক মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয়দের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে উখিয়ার হাসপাতালেও রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়তি সিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একই কথা জানান টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘দিন দিন ডিপথেরিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।’
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘টেকনাফ ও উখিয়া মিলিয়ে দুই হাজার ২৭ জন নয়, ৩ হাজার ১০০ জন রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষ ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর ২৭ জন নয়, মারা গেছেন ৩০ জন।’ তিনি আরও জানান, ডিপথেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে সেজন্য তারা তৎপর রয়েছেন।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে নতুন নতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। এতো বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে একসঙ্গে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সত্যিই কঠিন। এরপরও কলেরা, হাম, ডায়ারিয়া, ম্যালেরিয়াসহ নানা রোগের টিকা ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। ডিপথেরিয়া রোধেও টিকা দেওয়া হচ্ছে।’ টেকনাফ ও উখিয়ার ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে বলেও জানান তিনি।







