১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একাত্তরের ১ মার্চ থেকেই। এ মাসের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য সশস্ত্র প্রস্তুতি শুরু হয় ময়মনসিংহে। ২ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর টাউন হল ময়দানের ঘাঁটি ঘেরাও করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ কাজে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এদিন পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে টাউন হলে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকদের দাবি, এভাবে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোতে দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষদের মনে দখলদার পাকিস্তানিদের রুখে দেওয়ার সাহস সঞ্চারিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আনিসুর রহমান খান বলেন, ‘১ মার্চ ইয়াহিয়া খানের ভাষণের পরই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ময়মনসিংহের আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা। এদিন আইনজীবীরা আদালতপাড়া থেকে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে টাউন হলের সামনে আসলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকসহ মুক্তিকামী সাধারণ মানুষরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান আর্মি সেদিন মিছিলে বাধা দেয়নি। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া সেদিনের মিছিল পরবর্তী সময়ে শক্তি জুগিয়েছিল স্থানীয় মুক্তিকামী ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের মনে।’
গৌরীপুর আসনের সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদ (একাত্তরে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি) বলেন, ‘ইয়াহিয়া খানের ভাষণের পর ২ মার্চ টাউন হল চত্বরে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে সমাবেশ ডাকা হয়। ১ মার্চ শহরে মাইকিং করে টাউন হল প্রাঙ্গণের সমাবেশের কথা সাধারণ মানুষকে জানানো হয় এবং এর আগের রাতে ছাত্রলীগ কর্মীরা স্বাধীন বাংলাদেশের কয়েকশ’ পতাকা তৈরি করে শহরের বিভিন্ন স্থানে টাঙ্গিয়ে দেন।’
তিনি আরও জানান, তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ভাষা সৈনিক রফিক উদ্দিন ভূঁইয়ার বাসায় ২ মার্চের সমাবেশের প্রস্তুতিমূলক সভা করা হয়। পরের দিন অর্থাৎ ২ মার্চ টাউন হল প্রাঙ্গণের বিশাল মাঠে সমাবেশে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, তিনি ও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের পতাকা আগুনে পোড়ানো হয় এবং বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। এসময় টাউন হলের চারদিকে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র তাক করে রেখেছিল। তবে তারা গুলি ছুড়েনি। সেদিন পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানো এবং বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর মধ্যদিয়ে গর্জে উঠেছিল ময়মনসিংহের মুক্তিকামী বীরজনতা।
পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানোতে সেদিন এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন বলে জানান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এএইচএম খালেকুজ্জামান। তবে তারও দাবি, এ ঘটনা ছিল দেশের মুক্তির জন্য একটা ‘টার্নিং পয়েন্ট’। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আগেই ময়মনসিংহে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ছিল এক বড় ঘটনা। এর মধ্যদিয়ে সাধারণ মানুষসহ মুক্তিকামী মানুষ বুঝেছিল, এই দেশ পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করতেই হবে।’
গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম দুলাল জানান, ২৫ মার্চের আগে থেকেই জেলার মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। আনন্দ মোহন কলেজ, শহরের সিটি কলেজিয়েট স্কুল, জিলাস্কুল ও মহাকালী স্কুল মাঠে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য চলে অস্ত্র সংগ্রহ।
তিনি আরও জানান, ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে ছিল। তবে এরপর এ জেলার দখল নিয়ে নেয় পাকিস্তানি শত্রুসেনারা। এরপর তারা শুরু করে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ, যা ১০ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আর এ দীর্ঘ সময় তাদের এসব ঘৃণ্য অপরাধে সহায়তা করে আল-বদর ও রাজাকাররা।







