আন্তঃবিভাগে প্রতি ওয়ার্ডে বেডভর্তি রোগী। কিন্তু চিকিৎসক মাত্র একজন; আছেন কয়েক জন নার্স, তারাই এ বিভাগে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। বহির্বিভাগ ও জরুরিবিভাগেরও একই অবস্থা। রোগী অনেক। কিন্তু চিকিৎসক মাত্র দুই জন। চিকিৎসক সংকটে এ দুই বিভাগও সামলাচ্ছেন মূলত নার্সরা।
এ চিত্র শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার কথা ৪৯ জন। কিন্তু আছেন মাত্র তিন জন।
বৃহস্পতিবার (৫ এপ্রিল) এ হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে সরকারি চিকিৎসা নিতে এসেছেন তিন শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু। কিন্তু চিকিৎসক সংকটে তারা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না।
ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, বর্তমানে এখানে মাত্র তিন জন চিকিৎসক রয়েছেন। তারা হলেন– উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ্ মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা, জুনিয়র গাইনি কনসালট্যান্ট ডা. হোসনে আরা এবং মেডিক্যাল অফিসার ডা. আব্দুর রশিদ। এর মধ্যে ডা. আব্দুর রশিদকে পাশের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ১ এপ্রিল প্রেষণে এখানে আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের টিকেট কাউন্টার এবং চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে রোগীদের লম্বা লাইন। কিন্তু হাসপাতালে আছেন কেবল ডা. আব্দুর রশিদ। তিনি তার তার কক্ষে বসে লম্বা লাইন পেরিয়ে আসা এক রোগী দেখছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুনিয়র গাইনি কনসালটেন্ট ডা. হোসনে আরা তখনও (সকাল ১০টা) অফিসে আসেননি। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে অফিস সময় শুরু হলেও তিনি বেলা ১১টায় এসে তার কক্ষে প্রবেশ করেন। আর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ্ মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চেকআপের জন্য সকাল সোয়া ১০টায় নিজ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান, ফিরে আসেন দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে।
উপজেলা সদরের ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ধানকাঠি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের মোক্তার হোসেনের স্ত্রী সাবিনা বেগম তার আড়াই মাস বয়সী মেয়ে জান্নাতকে নিয়ে সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হয়ে ১০টায় হাসপাতালে এসে পৌঁছেছেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, তার আসার পর ২-৩ জন রোগী দেখেই ডা. বদরুদ্দোজা তার কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে টানা তিন ঘণ্টা সাবিনা বেগম তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। পরে দুপুর ১টায় ডা. বদরুদ্দোজা হাসপাতালে ফিরলে সাবিনা বেগম তার বাচ্চাকে দেখিয়ে দেড়টার দিকে বাড়ির পথ ধরেন।
একই অবস্থা দারুল আমানের কহিনুর বেগম, সিড্যার আসমা বিবি, পূর্ব ডামুড্যার জরিনা খাতুনসহ অনেকের।
চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের অভিযোগ, হাসপাতালের বহির্বিভাগে যখন রোগীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে, তখন ডা. বদরুদ্দোজা হাসপাতালে ভর্তি রোগী দেখতে রাউন্ডে চলে যান। আর ২-৩ ঘণ্টা পর তিনি যখন ফিরে আসেন তখন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক রোগীই হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, একমাত্র নারী চিকিৎসক ডা. হোসনে আরা প্রতিদিন শরীয়তপুর সদর থেকে ডামুড্যা এসে অফিস করেন। এজন্য সকালে আসতে তার প্রায়ই দেরি হয়। প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসেন। এদের কেউ কেউ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ডাক্তার না দেখিয়েই চলে যান।
বাহেরচর গ্রামের মোক্তার হোসেনের স্ত্রী সাবিনা বেগম বলেন, ‘আড়াই মাসের বাচ্চা নিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা হাসপাতালে দাঁড়িয়ে থাকাটা কতটা কষ্টের, সেটা ডাক্তাররা বুঝতে চান না। এমনিতেই ডাক্তার নাই। তার ওপর একজন ডাক্তার যদি ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত রাউন্ডে গিয়ে বসে থাকেন, তাহলে হাসপাতাল কেমনে চলে?’
এ বিষয়ে ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ্ মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বলেন, ‘মাত্র তিন জন ডাক্তার মিলে হাসপাতাল চালাতে হচ্ছে। আমি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়েও বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা দিয়ে থাকি। রোগীরা অভিযোগ করলেও আমাদের কিছু করার নেই। আমরা স্বল্প জনবলে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’








