বৃহস্পতিবার রাঙামাটির নানিয়ারচরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমাকে প্রকাশ্যে এবং খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা একদিন পার হতে না হতেই শুক্রবার তার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে নানিয়ারচর-মহালছড়ি সীমান্তের কেংড়াছড়ি এলাকায় দুর্বৃত্তদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ আরও পাঁচজন। গুলিবিদ্ধ হন আরও আটজন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তপনজ্যোতি বর্মাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর নেতারা। খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নয়নময় ত্রিপুরাও জানান, ‘নিহতদের প্রত্যেকের মাথায় গুলির চিহ্ন আছে। মৃত্যু নিশ্চিত করতেই তাদের মাথায় গুলি করা হয়েছে।’
ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর একাধিক নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, নানিয়ারচর-মহালছড়ি সীমান্তের কেংড়াছড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল। প্রথমে মাইক্রোবাস চালক সজীব হাওলাদারকে গুলি করা হয়। তখন গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশে টিলায় ধাক্কা খায়। পরে মাইক্রোবাসের কাছে গিয়ে ব্রাশফায়ার করে। তপনজ্যোতির মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।
মাইক্রোবাসের আরোহী ও গুলিবিদ্ধ শান্তি রঞ্জন চাকমা জানান, ‘আমাদের মোট ১৩টি মাইক্রোবাস ছিল। আর প্রথম গাড়িটি ছিল এসকর্টের গাড়ি। সেই গাড়িতে ছিলেন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা বর্মা। শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে কেংড়াছড়ি এলাকায় পৌঁছার পর একটি টিলার ওপর থেকে প্রথম গাড়ি লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে।’এর পরে আর কিছু মনে নেই বলে জানান তিনি।
ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এর সংগঠন লিটন চাকমা বলেন, ‘তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাই মূল টার্গেট ছিলেন। অনেকগুলো গাড়ির মধ্যে থেকে তাকে বহনকারী গাড়িতেই হামলা চালানো হয়। এ থেকে স্পষ্ট হয় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করেই তপনজ্যোতিকে হত্যা করা হয়েছে।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শক্তিমান চাকমা তার সরকারি বাসভবন থেকে স্থানীয় বাজারে যান। বাজার থেকে মোটরসাইকেলে করে উপজেলা পরিষদের সামনে আসেন। মোটরসাইকেল থেকে নামতেই গুলি করা হয় তাকে। ঘটনাস্থলেই মারা যান শক্তিমান চাকমা। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শক্তিমান চাকমার লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তার সহকারী রুপম চাকমা (৩৫) আহত হয়েছেন।
এই ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ এর শীর্ষ নেতাদের দায়ী করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। বৃহস্পতিবার (৩ মে) রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) অভিযোগ করে, ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা, সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা, আনন্দ প্রকাশ চাকমা ও রঞ্জন মনি (আদি) হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইউপিডিএফ সদস্য লক্কোচ চাকমা এক সহকারী নিয়ে গুলি চালিয়ে শক্তিমানকে হত্যা করে।
শক্তিমান ও তপনজ্যোতিসহ ছয়জনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে অভিহিত করেছে ইউপিডিএফ। দলের অন্যতম সংগঠক মাইকেল চাকমা বলেন, ‘আমরা মানুষ হত্যায় বিশ্বাসী নই। কোনও মানুষ এভাবে মৃত্যুবরণ করুক এটা আমরা চাই না। এ সব ঘটনার সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মার কোনও দল নেই। সে একজন সন্ত্রাসী। সন্ত্রসী হওয়ার ফলে তার অনেক শত্রু থাকতে পারে। তারাই এমন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আমাদের ধারণা।’
আরও পড়ুন-
সোম ও মঙ্গলবার তিন পার্বত্য জেলায় হরতাল
রাঙামাটিতে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মামলার সিদ্ধান্ত আরও পরে: পুলিশ
রাঙামাটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ইউপিডিএফের পাঁচ সদস্য নিহত, গুলিবিদ্ধ ৯
শেষকৃত্যে যোগ দিতে গিয়ে লাশ হলেন তারা
'ইউপিডিএফ নেতাদের নির্দেশে লক্কোচ চাকমা হত্যা করে শক্তিমানকে'








