ঘর ভাড়ার টাকা দিতে ত্রাণ বিক্রি করছে অনেক রোহিঙ্গা

টেকনাফ প্রতিনিধি
০১ জুলাই ২০১৮, ০৭:৫৯আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৮, ১৩:২১

কক্সবাজারে শরণার্থী ক্যাম্প ত্রাণ বিক্রির টাকায় ঘর ভাড়া দিতে হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহায়-সম্বল ফেলে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এজন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে পাওয়া ত্রাণ খোলা বাজারে কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে।

শনিবার (৩০ জুন) সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত চারটি রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস নির্যাতনের পর গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে তারা উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টির মতো শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সরেজমিন দেখা যায়, টেকনাফের জাদিমুড়া পাহাড়ের ওপরে গড়ে উঠেছে একটি অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবির। সেখানে চার হাজার রোহিঙ্গার জন্য ১১৫টি ঝুপড়ি ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘরের মাসিক ভাড়া ৫০০ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দা মো. ছব্বির, মো. ইলিয়াছ, সাইফুল ইসলাম ও নূর মোহাম্মদ নিজেদের ওই জমির মালিক দাবি করে ঘরের ভাড়া আদায় করছেন। এরমধ্যে মো. ছব্বির ৩০টি ঘর, মো. ইলিয়াছ ২০টি, সাইফুল ইসলাম ২৫ ও নূর মোহাম্মদ ৪০টি ঘরের ভাড়া আদায় করছেন।

টেকনাফের লেদার তুলাবাগান এলাকায় আড়াই একর জমিতে রয়েছে রোহিঙ্গাদের আরেকটি শিবির। সেখানে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গার জন্য ১৪২টি ঝুপড়ি ঘর রয়েছে এখানে। এই জমির মালিক দাবিদার দিল মোহাম্মদ প্রতিটি ঘর থেকে মাসে ৫০০ টাকা করে ভাড়া তুলছেন। এছাড়া, আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা আরও প্রায় সাত হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে ঘর ভাড়ার টাকা জোগাতে হয়। তারা মূলত ত্রাণ বিক্রি করেই ঘর ভাড়ার টাকা পরিশোধ করেন। তবে এই ৫০০ টাকা জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো।

জানতে চাইলে টেকনাফের তুলাবাগান জায়গার মালিক দাবিদার দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘এই জায়গাটি আমার বাপ-দাদার আমলের। এখানে ধানচাষ করে আমাদের পুরো পরিবারের সংসার চলতো। মানবিক কারণে সেখানে এখন রোহিঙ্গাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে।’ তাহলে টাকা নিচ্ছেন কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন তাদের কাছ থেকে কোনও টাকা নেইনি। কী করবো, আমাদেরও তো বাঁচতে হবে। তাই তারা যা দিচ্ছে, তা নিচ্ছি। ’

টেকনাফের লেদা রাস্তার পূর্বে লবণের মাঠে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন রোহিঙ্গা নাগরিক মো. একরাম। তিনি বলেন, ‘কম খেয়ে বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু ঘর ছাড়া কি সহজে বেঁচে থাকা যায়? ওপারে (রাখাইনে) সেগুন কাঠের তিনতলা বাড়িতে সুখের সংসার ছিল, আর এপারে কাদামাটিতেও সংসারের সুযোগ সহজে মিলছে না। যে জায়গায় ধানের চাষ হতো, সেখানে ছোট্ট একটি তাঁবুর নিচে প্রথমে ঠাঁই হয়েছিল। তবে ভাড়া দিতে না পারায় বেশি দিন সেখানে থাকা হয়নি। ত্রাণ বিক্রি করে মাসে ৫০০ টাকার বিনিময়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে নাফ নদী পেরিয়ে সাত মাস আগে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। সঙ্গে ছিল পরিবারের আট সদস্য।’ একরাম জানান, মিয়ানমারের পেরাংপুল গ্রামে তার বাড়ি । সেখানে তার তিনতলা কাঠের বাড়ির একেক তলায় পাঁচটি করে কক্ষ ছিল। নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেন ।

একরাম জানালেন, লবণের মাঠে যে জায়গাটিতে পরিবার নিয়ে এখন আছেন, মো. ইলিয়াছ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি ওই জায়গার মালিক বলে দাবি করেন। কিছু দিন যেতে না যেতে ঘর ভাড়ার টাকা দাবি করেন ইলিয়াছ। টাকা দিতে না পারলে ঘর ছেড়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তখন থেকে সরকারি-বেসরকারিভাবে পাওয়া ত্রাণ বিক্রি করে ভাড়ার টাকা শোধ করছেন তিনি। ‘কম খেয়ে হলেও ঘর ভাড়ার টাকা দিতে হচ্ছে। না হলে কই থাকবো’—বললেন একসময়ের সচ্ছল গৃহস্থ বর্তমানে নিঃস্ব শরণার্থী মো. একরাম। টেকনাফ লামা বাজারে ত্রাণ বিক্রি করছিলেন রহিম উল্লাহ ও রহিমা বেগম নামে দুই রোহিঙ্গা। রহিম উল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন এনজিও থেকে পাওয়া কিছু ত্রাণ বাজারে বিক্রি করছি। কেননা, মাস শেষে ঘর ভাড়া দিতে হবে। তাই সকাল থেকে এখানে বসে ত্রাণ বিক্রি করে কিছু টাকা উপার্জন করছি। ’

হ্নীলা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ঘর ভাড়া দিতে স্থানীয় দোকানে কম দামে ত্রাণ বিক্রি করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ঘর ভাড়ার নগদ টাকার জন্য তারা ত্রাণ বিক্রি করছে।’

সাত হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। তাদের সবারই ঘর ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এই টাকার জন্য তাদের ত্রাণ বিক্রি করতে হচ্ছে।’

টেকনাফ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি জমিতে যেসব রোহিঙ্গা শিবির গড়ে উঠেছে, সেখানে রোহিঙ্গারা বিনা ভাড়ায় থাকছে। এসব শিবির থেকে কারও ভাড়া নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তারপরও জমির মালিকানা দাবি করে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ঘর ভাড়া তোলার বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

/এপিএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম