রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে অন্য পুরুষ প্রার্থীদের সঙ্গে লড়াই করার সুযোগ রয়েছে নারীদের। তবে এবার সাধারণ কাউন্সিলর পদে নারীদের অংশগ্রহণ একবারেই কম। ৩০টি ওয়ার্ডে ১৬৬ জনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী হয়েছেন নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুন নাহার বেগম।
তফসিল অনুযায়ী রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে প্রার্থী যাচাই বাছাই শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের পর ২২৭ জন প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন মেয়রসহ ২২৩ জন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ কাউন্সিলর ১৬৬ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ৫২ জন রয়েছেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন অফিসার আতিয়ার রহমান বলেন, ‘সাধারণ কাউন্সিলর পদে কেন নারীদের অংশগ্রহণ নেই তা বলতে পারবো না। যদিও নারীদের সরাসরি এসব পদে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
সুযোগ থাকার পরও সাধারণ কাউন্সিলর পদে জনপ্রতিনিধি হওয়ার পথে রাজশাহীর নারীরা কেন পিছিয়ে এ ব্যাপারে বিভিন্নজনের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয়। মঙ্গলবার বিকালে নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের দড়িখরবোনা এলাকায় রেল লাইনের পাশে ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী সামসুন নাহার। তিনি সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত কাউন্সিলর পদে ছিলেন। কেন সাধারণ কাউন্সিলর পদে দাঁড়ালেন না প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী বলেন, ‘আসলে বাংলাদেশটা এখনও পুরুষশাসিত দেশ হিসেবেই রয়ে গেছে। যতই মুখে বলুক ছেলেদের মতো মেয়েদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে গিয়ে দেখি মেয়েদের অধিকার অনেক কম। তিনটি ওয়ার্ডে ৩০-৪০ হাজার ভোটার থাকে। তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে বিজয়ী হলে পরিষদে গিয়ে কম ভোটে পাস করা পুরুষদের চেয়ে আমাদের মূল্যায়নটা কম হয়।’ তাহলে কেন সাধারণ কাউন্সিলর পদে এবার প্রার্থী হলেন না-এমন প্রশ্নে সামসুন নাহার বলেন, ‘পুরুষদের সঙ্গে ভোটের মাঠে আমরা লড়াই করবো। এটা অনেকে আছেন পছন্দ করে না। আবার আমাদের অর্থ কম। ছেলেদের অর্থ বেশি থাকে। এসব ভয় থেকেই নারীরা সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার সাহস পায় না।’
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মর্জিনা পারভীন বলেন, ‘আমরা মেয়রকে বেশি প্রাধ্যন্য দিতে গিয়ে কাউন্সিলর পদে তেমন গুরুত্ব দেই না। তবে এবার আমাদের কিছু সদস্য সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে দাঁড়িয়েছে। এতে করে আস্তে আস্তে আমরাও অগ্রসর হচ্ছি। আবার অর্থনৈতিকভাবে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এখানে অনেক পিছিয়ে আছে। তাই পুরুষদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তৈরি হতে পারে না। আবার অনেক পুরুষ আছে যারা চান না নারীরা সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করুক।’
নুরুন নাহার বেগম রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র। তিনবার সংরক্ষিত আসনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি এবার সংরক্ষিত কাউন্সিলর আসন ছেড়ে নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। তার বিপক্ষে পুরুষ কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন দুইজন। এরা হলেন সাবেক কাউন্সিলর আকবর হোসেন ও বর্তমান কাউন্সিলর তরিকুল আলম পল্টু। এবার সংরক্ষিত আসন ছেড়ে সাধারণ কাউন্সিলর পদে কেন নির্বাচন করছেন-এমন প্রশ্নে রাজশাহী মহানগর জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুন নাহার বেগম বলেন, ‘তিনবারই সংরক্ষিত আসনে বিজয়ী হয়েছি। জনগণের কাছে বারবার গিয়েছি। তারাও আমাকে নিরাশ করেননি। কিন্তু তাদের (ওয়ার্ডবাসী) জন্য কোনও উন্নয়নমূলক কাজ তেমন করতে পারিনি। কারণ ওয়ার্ডের সব কাজের ক্ষমতা থাকে সাধারণ কাউন্সিলরদের হাতে। এতে করে আমাদের হাতে তেমন কাজ থাকে না। আবার পুরুষ কাউন্সিলরা আমাদের কোনও কথাও শোনে না। ফলে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটতে পারি না। এরপরও জনগণের মাঝে পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে থেকেছি। যতোটুকু পেরেছি কাজ করেছি। পরীক্ষিত কাউন্সিলর হিসেবে অনেক কাজ শিখেছি। যেই কাজগুলো সাধারণ কাউন্সিলর পদে বিজয়ী হলে আমি করতে আরো ভালোভাবে করতে পারবো। এজন্য ২৫নম্বর ওয়ার্ডবাসীর সমর্থন নিয়ে এবার সাহস করে সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছি।’
আপনার মতো অন্য নারীরাও কেন সাধারণ কাউন্সিলর পদে আসছেন না- এমন প্রশ্নে নুরুন নাহার বেগম বলেন, ‘প্রতিটা ওয়ার্ডে যে পরিমাণ টাকার প্রতিযোগিতা হয়, সেখানে যোগ্যতা, সততা, পরিশ্রমের, নীতির প্রতিযোগিতা হয় না। পুরুষের এই টাকা আছে, যেটা নারীদের কাছে তেমন নেই। এই ভয়ে অনেকের ইচ্ছা ও সাহস থাকলেও সংরক্ষিত আসন ছাড়তে চায় না। তাই তারা ওই আসনে লড়াই করে থাকেন। আমরা টাকা নেই। কিন্তু আমার আছে সততা, নীতি, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, পরিশ্রম। এনিয়ে এবার সাধারণ কাউন্সিলর পদে লড়াই করার জন্য নেমেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেকে বলছে আপনি তো তাদের সঙ্গে পারবেন না, এবার ভুল করলে না তো। নানান প্রশ্ন। আমি তাদের বলেছি আমি ইচ্ছা করেছি। আপনারা সবাই আমাকে সমর্থন দেবেন।’
রাজশাহী জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘নুরুন নাহার উপযুক্ত পদেই এবার দাঁড়িয়েছেন। তার দেখে অন্য নারীদেরও এগিয়ে আসা উচিত। এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।’
নারীদের উন্নয়ন নিয়ে রাজশাহীতে কাজ করেন বেসরকারি সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’র প্রজেক্ট কো অর্ডিনেটর এহসানুল আমিন ইমন। তিনি বলেন, ‘মেয়রদের মতো এখন কাউন্সিলর প্রার্থীরাও রাজনৈতিক ভাবে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু এখনও প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গায় নারীরা আসেনি। যার কারণে এসব পদে নারীদের সমর্থন করার মানসিকতাও দেখা যায় না রাজনৈতিক দলগুলোতে। আবার ভোটারদের মধ্যে নারী কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতি এক ধরনের অনিহা থাকে। কারণ একটা ওয়ার্ডে অনেক ধরনের কাজ থাকে এবং নারীরা তা পারবে না বলে ভোটারা মনে করেন। তাদের আস্থার জায়গাটাই নেই। তাই তাদের আস্থা তৈরি করতে হবে। এজন্য প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে। এক সময় ভোটাররাই নারী প্রার্থী চাইবে। প্রশাসনে এক সময় নারীরা ছিল না। কিন্তু এখন তারা ছেলেদের পাশাপাশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে।’
অন্যদের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে প্রচুর অর্থ খরচ হয়। নারীদের কাছে সে অর্থ থাকে না। তারা আয় করে নিয়ে গেলেও স্বামীর হাতে তুলে দেন। তাই জনগণকে তাদের উৎসাহ দিয়ে সমর্থন দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী প্রার্থী দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে একদিন নারীরাও জড়তা, ভয় কাটিয়ে সাধারণ কাউন্সিলর পদে লড়াই করতে এগিয়ে আসবেন।’
আরও পড়ুন- তামাকমুক্ত রাজশাহী গড়ার প্রতিশ্রুতি বিএনপির মেয়রপ্রার্থী বুলবুলের








