রংপুরে আদালত চত্বরে লাঞ্ছিত হয়েছেন মানহানির মামলায় গ্রেফতার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এ সময় তাকে উদ্দেশ করে পচা ডিম ও জুতা স্যান্ডেল ছুড়েছে বিক্ষুব্ধরা। একইসঙ্গে আদালত চত্বরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (৪ নভেম্বর) দুপুরের এই ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আইনজীবী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। মামলায় উভয় পক্ষের শুনানি শেষে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে আজ রবিবার রংপুরের আদালতে আনা হচ্ছে এমন খবরে সকাল থেকেই উত্তপ্ত ছিল শহরের আদালত ও আশপাশের এলাকা।
পুলিশ ও আইনজীবীরা জানান, মইনুল হোসেনকে শনিবার ঢাকার কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। রবিবার দুপুর সোয়া ১২টায় তাকে আদালতে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকাল থেকে মহিলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন নারী সংগঠন আদালত চত্বরে মইনুল হোসেনের বিচারের দাবিতে অবস্থান নিয়ে ঝাড়ু মিছিল ও বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও বিক্ষোভকারীদের নিবৃত্ত করতে পারেনি। পরে নগর ডিবির পুলিশ সদস্যরা আদালতের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত পুরো এলাকা কর্ডন করে ফেলে। এরপর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সামনে পেছনে তিনটি পুলিশের গাড়িবহর ও মাঝখানে মইনুল হোসেনকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়। তার আগমনের খবর পাওয়ার পরপরই তাকে বহন করা মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে পচা ডিম আর জুতা স্যান্ডেল নিক্ষেপ শুরু করে বিক্ষুব্ধরা। অন্যদিকে নারী কর্মীরা ঝাড়ু প্রদর্শন করে বিক্ষোভ করতে থাকে।
তারা আরও জানান, মইনুল হোসেনকে মাথায় হেলমেট পরিয়ে মাইক্রোবাস থেকে নামানোর সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে লাঞ্ছিত করে। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে আবারও পচা ডিম ও জুতা নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে তাকে পুলিশ কর্ডন করে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আরিফা ইয়াসমিন মুক্তার আদালতে নেওয়া হয়। এরপরই আদালতের ভেতরের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে সকলের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ওই আদালতে জামিনের শুনানি শুরু হয়। আসামি পক্ষে জামিনের শুনানিতে তার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানান। অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জামিনে আপত্তি করেন। পরে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে মইনুল হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর দেড়টার দিকে মইনুল হোসেনকে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও পাল্টা মিছিল বের করলে দুইপক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। সংঘর্ষে দুই পক্ষের কমপক্ষে ১৫ জন আহত হন। এরমধ্যে বাদীপক্ষের আইনজীবী এপিপি দিলশাদ হোসেন মুকুলের মাথা ফেটে যায়।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের আইনজীবী মাসুদ রানা বলেন, ‘আদালত আমাদের বক্তব্য শোনার পরও জামিনযোগ্য মামলায় জামিন নামঞ্জুর করেছেন। আমরা আশাহত। সরকারদলীয় লোকজন আমিসহ রংপুরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী পিপি আব্দুল মালেক বলেন, ‘আদালত চত্বরে পুলিশের সামনে বিএনপির সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক আইনজীবীরা তাণ্ডব চালিয়েছে। তাদের গ্রেফতার করা হোক। এই মামলার ধার্য তারিখ আগামী ২২ নভেম্বর হওয়ায় আমরা আদালতকে বলেছিলাম, বাদীর অনুপস্থিতিতে জামিনের শুনানি হতে পারে না। বিজ্ঞ আদালত জামিন নামঞ্জুর করেছেন।’
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক দিলশাদ হোসেন মুকুল বলেন, ‘বিএনপি সন্ত্রাসীরা কয়েকজন আইনজীবীর সহায়তায় কাটারাইফেল রামদাসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বাশার বলেন, ‘তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালালো অথচ পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এর বিচার না হলে আমরা আন্দোলনে যাবো।’
রংপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাসিমা জামান ববি বলেন, ‘মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে আমরা বিক্ষোভ করছি এবং আমাদের এ আন্দোলন চলবে।’
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দুইপক্ষকেই নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
কোতোয়ালি থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, ‘ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, সম্প্রতি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলে এতে যোগ দেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এরপর গত ১৬ অক্টোবর রাতে ৭১ টেলিভিশনের একটি টকশোতে চ্যানেলটির আমন্ত্রণে বাসা থেকে যুক্ত হন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। অনুষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থিত আমাদের নতুন সময় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মাসুদা ভাট্টি তাকে প্রশ্ন করেন ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আপনি জামায়াতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনি আসলে কাদের হয়ে সেখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন?’ এ প্রশ্ন শুনে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ক্ষুব্ধ হন এবং জবাবে তাকে বলেন, ‘আপনার দুঃসাহসের জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে আমি চরিত্রহীন বলে মনে করতে চাই।’ একজন নারী সাংবাদিককে এমন জবাব দেওয়ায় অনুষ্ঠানটির পর অন্য নারী সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টরা প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন তার ওই মন্তব্যের জন্য বিবৃতি পাঠিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন। কিন্তু এতে তারা সন্তুষ্ট না হয়ে প্রকাশ্যে ক্শা চাওয়ার দাবি জানাতে থাকেন। এরপর রাজনীতিবিদরাও ব্যারিস্টার মইনুলের এমন আচরণের সমালোচনা করতে থাকেন। ২১ অক্টোবর ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে মাসুদা ভাট্টি বাদী হয়ে ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। পরে জামালপুর ও কুড়িগ্রামে আরও দুটি মানহানির মামলা দায়ের হয় তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে দুটি মামলায় জামিন নেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তবে ২২ অক্টোবর গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ঘটনায় ব্যারিস্টার মইনুলের সমালোচনা করেন এবং তার বিরুদ্ধে আরও মামলা হলে সরকার সেটা দেখবে বলে মন্তব্য করেন। এসময় তার দলের নারী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ করার নির্দেশ দেন। সেদিন সন্ধ্যায় রংপুরে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের হলে তাকে রাজধানীর উত্তরায় জেএসডি নেতা আ স ম আবদুর রবের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও অনেক মানহানির ও নালিশি মামলা দায়ের হয়েছে।







