নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৬ জনের সবাই গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জন দায় স্বীকার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এদের মধ্যে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া দুই তরুণীসহ পাঁচজন রয়েছে। অপর তিন আসামি সোনাগাজী পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুর রহমান, মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফসার উদ্দিন ও মোহাম্মদ শামীম ওরফে শামীম এখনও রিমান্ডে রয়েছে। এদের তিন জনের জিজ্ঞাসাবাদের পর জবানবন্দি নেওয়ার কাজ শেষ হলে অভিযোগপত্র তৈরির কাজে হাত দেবে পিবিআই। এমাসেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বুধবার (৮ মে) আদালত শুনানি শেষে নুসরাত হত্যা মামলার আলামত উদ্ধারসহ তা শনাক্ত করার জন্য আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও মো. জোবায়েরের তৃতীয় দফা একদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিচারক। এর আগে তারা তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূরক জবানবন্দি দিয়েছে।
মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই’র চট্টগ্রাম বিভাগের স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. ইকবাল এ তথ্য জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় চলতি মাসেই অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার সম্ভাবনার রয়েছে।’
স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. ইকবাল জানান, নুসরাতের গায়ে আগুন লাগাতে বোরকা পরে আসে দুর্বৃত্তরা। তারা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। ইতোমধ্যে কেরোসিন ও বোরকা বিক্রেতা ও বোরকা দোকানের কর্মচারী, নুসরাতের দুই বান্ধবী তথা আলিম পরীক্ষার্থী, মাদ্রাসার একজন নৈশপ্রহরী ও একজন পিয়নসহ মোট সাতজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত। এই সাতজনই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত।
পুলিশ সুপার মো. ইকবাল আরও জানান, নুসরাতের ওপর অগ্নিসন্ত্রাসের দিন অন্যতম প্রধান তিন আসামি শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম, জুবায়ের আহমেদ ও জাবেদ হোসেন বোরকা পরিহিত ছিলেন। পিবিআই আলামত হিসেবে দুটি বোরকা উদ্ধার করেছে। জুবায়েরের ব্যবহৃত বোরকা গত ২০ এপ্রিল সোনাগাজী কলেজ-সংলগ্ন একটি খাল থেকে এবং শামীমের ব্যবহৃত বোরকা গত ৪ মে মাদ্রাসার পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু জাবেদ হোসেনের ব্যবহৃত বোরকা উদ্ধার করা যায়নি। বোরকাগুলো কিনেছিলেন আরেক ছাত্রী কামরুন নাহার ওরফে মণি। মণিও গ্রেফতার হয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, গত ১৪ এপ্রিল ফেনীর আদালতে দায় স্বীকার করে প্রথম জবানবন্দি দেয় শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম ও নুর উদ্দিন। গত ২৭ মার্চ নুসরাতের শ্লীলতাহানি থেকে শুরু করে ৬ এপ্রিল তার ওপর অগ্নিসন্ত্রাস চালানোর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয় তারা। এই হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা বিষয়টি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে জানায়।
নুসরাত হত্যাকাণ্ডের আগে অধ্যক্ষ ‘সিরাজ উদ দৌলা মুক্তি পরিষদ’ নামের ২০ সদস্যের কমিটির জন্য টাকা দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জনৈক কেফায়েত উল্লাহ। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিল নুর উদ্দিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম। নুর উদ্দিন সোনাগাজী মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং শাহাদাত হোসেন একই মাদ্রাসার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল।
প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিল। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা এর আগে তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ উঠে। এ অভিযোগে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্ন ভাবে নুসরাতের পরিবারতে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যায় নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। তাকে মামলা তুলে নেওয়া কথা বলে ভয় দেখানো হয়। পরে সেখানে বোরকা পরিহিত ৪/৫ ব্যক্তি নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখান প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।
ওই ঘটনায় গত ৮ এপ্রিল রাতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। গত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেয়। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আটজন। মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইতে হস্তান্তর হওয়ার পর তারা ২২ জনকে গ্রেফতার করে।








