রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) তড়িঘড়ি বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বোর্ডের সাক্ষাৎকার গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার সময় নিয়োগের আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। এছাড়া সব ধরনের অবকাঠামো থাকার পরেও সিন্ডিকেট সভা ও নিয়োগ বোর্ড রংপুরে না করে ঢাকায় আয়োজন করা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বোর্ডের ও সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে দুই সিন্ডিকেট সদস্য সভা বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতর ও প্রশাসনিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন একমাসের ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা অবস্থায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১০টি পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখ দেওয়া হয়েছিল ২৭ জুন। এরপর থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ৪৪ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ আপগ্রেডেশনসহ চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন। তারা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ ও অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এজন্য উপাচার্য রেজিস্ট্রারসহ কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ করতে পারেননি। এ অবস্থায় পোস্ট অফিস বা বিভিন্ন মাধ্যমে করা আবেদনপত্র ঠিকমতো অফিসে পৌঁছেনি বলে অনেক আবেদনকারী অভিযোগ করেছেন।
২৭ জুন আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন হওয়ায় অনেকেই আবেদন করতে পারেননি। অন্যদিকে ২৮ ও ২৯ জুন শুক্র ও শনিবার হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। এরই মধ্যে আবেদনকারীদের সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি ৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি বন্ধের দিন থাকলেও ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে না করে ঢাকায় নিয়োগ বোর্ডের সভা করা হয়। সেই নিয়োগ বোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার পদে হাতেগোনা কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এরপর বাকি পদের জন্য গতকাল বুধবার আবারও ঢাকায় পরপর তিনটি নিয়োগ বোর্ডে তড়িঘড়ি করে আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেন উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহসহ বোর্ডের কয়েকজন সদস্য। ঢাকায় নিয়োগ বোর্ড করার প্রতিবাদে বোর্ডের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ফরিদুর রহমান ওই সভা বয়কট করেন।
এদিকে শিক্ষক সমিতি, ইউজিসি ও রংপুরের সুধীমহলের বারবার বিরোধিতার পরেও নিয়োগ পরীক্ষা ঢাকায় করার ব্যাপারে উপাচার্যের এত আগ্রহ কেন এমন প্রশ্ন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা।
রেজিস্ট্রার দফতর থেকে জানা গেছে, বুধবার যে তিনটি বোর্ডে আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো হলো– সহকারী পরিচালক জনসংযোগ, সহকারী গ্রন্থাগারিক, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও স্টোর কিপার। এর মধ্যে সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে মাত্র তিনজন আবেদনকারী রয়েছেন। অন্যান্য পদে ৮ থেকে ১০ জন মাত্র। এ পদ ছাড়া বাকি পদগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আবেদনকারী জমা না পড়ায় সেই পদে কোনও নিয়োগ বোর্ড হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাছাই কমিটির দুই সদস্য বলেন, ‘একে তো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তারপর কর্মচারীদের আন্দোলনের জন্য প্রশাসনিক ভবন বন্ধ থাকায় অনেক আবেদনপত্রের খবর নেই। তবে পছন্দের প্রার্থীদের আবেদন হাতে হাতে নেওয়া হয়েছে। তার পরেও পুরো প্রক্রিয়াটি লোক দেখানো হওয়ায় এবং তাড়াহুড়া করার কারণে আবেদনকারীর সংখ্যা কম হয়েছে।’ এভাবে নিয়োগ দেওয়া হলে স্বচ্ছতা থাকবে না বলে তারা মনে করেন।
এদিকে ১২ জুলাই ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সিন্ডিকেট সভা বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছেন দুই সিন্ডিকেট সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মাযহারুল আনোয়ার। এ ব্যাপারে সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক গাজী মাযহারুল আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের অবকাঠামো থাকার পরেও উপাচার্য কী কারণে সিন্ডিকেট সভা ঢাকায় আহ্বান করেন? এতে অর্থের অপচয়সহ অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শিক্ষক সমিতি বারবার উপাচার্যকে ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা আর নিয়োগ বোর্ড করার ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাছাড়া শিক্ষক সমিতি সাধারণ সভা করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছে। ফলে আমি মনে করি এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এবং রংপুর অঞ্চলের মানুষকে অপমানিত করা হচ্ছে।’ সার্বিক কারণে সিন্ডিকেট সভা বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। সেই সঙ্গে অন্যান্য সিন্ডিকেট সদস্যদের সভা বয়কট করার আবেদন জানান তিনি।
সিন্ডিকেট অপর সদস্য সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ফরিদুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের অবকাঠামো থাকার পরেও কেন ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা ও নিয়োগ বোর্ড হবে। আমি আগেও বলেছি ঢাকায় হলে যাব না। এবারও আমি বয়কট করেছি।’
এসব বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে গতকাল বুধবার বেশ কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এরপর তার ফোনে ক্ষুদে বার্তা দেওয়ার পর আবারও বেশ কয়েকবার ফোন করা হলে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন।’
উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।








