সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলাকালে কাছাকাছি এলাকায় গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা। এতে র্যাব কর্মকর্তাসহ সাত জন নিহত হন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আস্তানার পাশে গ্রেনেড হামলার মূল হোতা ছিল তিন জন। তবে তারা তিন জনই পৃথক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছে। এ কারণে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন এই ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি করার মতো কেউ নেই। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি বুধবার (২৮ আগস্ট) নিশ্চিত করে এসব তথ্য জানান পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক দেওয়ান আবুল হোসেন।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গ্রেনেড হামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী থানাধীন কুমার গড়িয়া গ্রামের মৃত সুলতান আহমদের ছেলে আশরাফুল আলম নাজিমকে (২২), দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থানাধীন ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের হাজী নূরুল হোসেনের ছেলে লোকমান হোসেন ওরফে মোশারফ ওরফে সোহেল (৩৮) এবং নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের অজ্ঞাত একজন পুরুষ সদস্যকে (২৮) চিহ্নিত করা হয়।
দেওয়ান আবুল হোসেন বলেন, ‘আলোচিত এ মামলাটি তদন্ত করে তিন জনকে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে আতিয়া মহলের বাইরে গ্রেনেড হামলার মূল হোতা ছিল জঙ্গি মোশারফ ও নাজিম। এই দুজন মৌলভীবাজার থেকে এসে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় গ্রেনেড হামলা চালায়। আতিয়া মহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচালিত অভিযানকে অন্যদিকে মোড় ঘোরাতে আতিয়া মহলের অদূরে মাদ্রাসার কাছে গ্রেনেড হামলা চালায় জঙ্গিরা।’
তিনি জানান, নব্য জেএমবির চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জঙ্গি নেতা মোশারফ হোসেন ওরফে সোহেলের পরিকল্পনায় অভিযান চলাকালেই গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল নাজিম উদ্দিন ও অজ্ঞাত ২৮ বছরের আরেক জঙ্গি। আতিয়া মহলে শ্বাসরুদ্ধকর ১১১ ঘণ্টার অভিযানে নিহত হয় দুর্ধর্ষ চার জঙ্গি। অভিযান চলাকালে প্রায় ১৩-১৫ বার বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এমনকি ঘটনার দায় স্বীকার করে বার্তা দেয় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ সিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামে ওই অভিযান শুরুর আগে আতিয়া মহলের পাঁচ তলা ভবনের ২৯টি ফ্ল্যাট থেকে নারী-শিশুসহ ৭৮ জনকে সরিয়ে নেন সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আতিয়া মহলের অদূরে মাদ্রাসার সামনে প্রথমে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। পরবর্তী সময়ে তাদের রেখে যাওয়া হলুদ রংয়ের একটি ব্যাগ জব্দ করতে গেলে ফের গ্রেনেডের বিস্ফোরণ হয়। এতে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, দুই পুলিশ ইন্সপেক্টরসহ সাত জন নিহত হন। আহত হন আরও ৫০ জন।
এ ঘটনায় মোগলাবাজার থানার এসআই শিপলু দাস (তৎকালীন) বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আতিয়া মহল থেকে বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় একই থানার এসআই সুহেল আহমদ (তৎকালীন) বাদী হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর প্রথমে থানা পুলিশের পাশাপাশি ঘটনার ছায়া তদন্তে নামে র্যাব এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। একপর্যায়ে মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই।
তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই জানায়, ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত মৌলভীবাজারের বড়হাট এলাকায় পুলিশ, সিটিটিসি ও সোয়াতের অভিযান চলাকালে জেএমবি সামরিক শাখার আত্মঘাতী দলের সদস্য নাজিম, অজ্ঞাত আরেক সদস্য এবং একজন নারী সদস্যসহ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। এছাড়া, আতিয়া মহলের অদূরে বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মোশারফ ওই বছরের ২৯ মার্চ মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে স্ত্রী ও পাঁচ কন্যাসহ বোমা বিস্ফোরণে মারা যায়।
পিবিআই সূত্র জানায়, সিলেটের আতিয়া মহলে অভিযান চলাকালে আত্মঘাতী জঙ্গি মর্জিনা খাতুনের ভাই জহিরুল হক, বোনের জামাই কামাল, প্রতিবেশী হাসানসহ নাইক্ষ্যংছড়ি থানার বাইসারী গ্রামের অনেককেই জঙ্গি নেতা মোশারফ তার দলে নিয়ে আসে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গি হিসেবে তৈরি করে। মর্জিনার বোন জোবাইদা ও তার স্বামী কামাল হোসেন, তাদের শিশু সন্তান ও দুই সহযোগী সীতাকুণ্ডে পুলিশের অভিযানকালে সুইসাইড বেল্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। একই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোগলাবাজার থানার আরেক মামলায় জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী আর্জিনা ওরফে রাজিয়া সুলতানাকে এ বছরের ১৭ জানুয়ারি পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পিবিআই। এ সময় তারা জানায়, তাদের আদর্শ হলো, কাছাকাছি এলাকায় ২/৩ দল বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবে। কেউ আক্রান্ত হলে অন্যরা জীবনবাজি রেখে এগিয়ে যাবে। এমনকি সিরিজ বোমা হামলা করার ক্ষেত্রেও তারা পিছপা হবে না।
তারা আরও জানায়, সেই আদর্শ থেকেই মৌলভীবাজার থেকে নব্য জেএমবির দুই সদস্যের একটি দল দুটি বোমা (গ্রেনেড) নিয়ে সিলেটে আসে। পুলিশের ব্যারিকেড থাকায় তারা বেশি দূর এগিয়ে যেতে না পেরে, জনতার ভিড়ে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায় এবং অন্য গ্রেনেডটি ফেলে রেখে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক দেওয়ান আবুল হোসেন আরও জানান, গত ১৪ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। গত ২২ জুলাই সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান প্রতিবেদনটি নথিভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে আদালত গত ২০ আগস্ট শুনানি শেষে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য নথিসহ সিডি সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠাতে নির্দেশ দেন।








